ইভ্যালিকে অবসায়ন করে দেনা পরিশোধের প্রস্তাব

চটকদার বিজ্ঞাপন আর লোভনীয় অফারের মাধ্যমে গ্রাহকদের প্রলোভন দিয়ে তাদের কাছ থেকে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে এখন আলোচনা-সমালোচনার শীর্ষে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি। গ্রাহকের মামলায় ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. রাসেল ও তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দুজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এখন তাদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

সর্বশেষ গত ৫ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ইভ্যালির পাঠানো প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ১৫ জুলাই পর্যন্ত ইভ্যালির মোট চলতি দায় ৫৪৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে মার্চেন্ট বা পণ্য সরবরাহকারীরা পাবেন ২০৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। আর গ্রাহকরা পাবেন ৩১১ কোটি টাকা। তবে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সংস্থাটিকে রাসেল জানিয়েছেন, ইভ্যালির দেনা প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া তার গ্রাহক সংখ্যা ৪৪ লাখ বলেও দাবি করেন তিনি।

এ অবস্থায় ইভ্যালিকে কোম্পানি আইন অনুযায়ী অবসায়নের মাধ্যমে দেনা পরিশোধের প্রস্তাব করেছেন বিশেষজ্ঞরা। শনিবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি আয়োজিত ‘ই-কমার্স খাতের চ্যালেঞ্জ: সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট ও করণীয়’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় তারা এ প্রস্তাব দেন।

সভায় ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সেলিম আরএফ হোসাইন বলেন, ইভ্যালি ও ই-অরেঞ্জসহ বেশ কয়েকটি ই-কমার্স কোম্পানি দেশের অর্থনীতিতে অনেক বড় বিপদ সংকেত দিয়েছে। ইভ্যালিসহ সম্প্রতি যা ঘটেছে তা সব পক্ষের লোভের কারণেই হয়েছে।

এখন জনগণের বিপুল পাওনা টাকা কোথায় আছে, তা খুঁজে বের করে যেটুকু পাওয়া যায়, তাই ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সবগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করেই ই-কমার্স খাত নিয়ন্ত্রণ করা উচিত বলে মত দেন তিনি।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) আইনজীবী ও করপোরেট আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তানজিব উল আলম বলেন, আইনের অভাব নেই, নতুন আইনেরও দরকার নেই। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা যদি বাড়ানো যায় এবং সেই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সততার সঙ্গে কাজ করে তাহলে এ ধরনের অনিয়ম ঠেকানো যাবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশন ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) যেসব আইন আছে, তা দিয়ে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। বিভিন্ন আইনের বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থাগুলো পদে পদে অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলে দায়ী করেন তানজিব।

প্রতিযোগিতা কমিশন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উদাহরণ টেনে তিনি আরও বলেন, কোন কোন অবস্থায় প্রতিযোগিতা কমিশন পদক্ষেপ নেবে সেগুলো প্রতিযোগিতা আইনে বলা আছে। কিন্তু আমরা বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই, প্রতিযোগিতা কমিশনের যখন যেখানে তৎপর হওয়ার দরকার ছিল, তখন ওনারা বসেছিলেন, পদক্ষেপ নেননি।

সভায় ই-কমার্সের কয়েকটি কোম্পানির টাকা নিয়ে পণ্য না দেওয়ায় ভোক্তা অধিদপ্তরে প্রায় ১৭ হাজার অভিযোগ পড়ার তথ্য দেন ব্যারিস্টার তানজিব। তিনি বলেন, কিন্তু এত বেশি অভিযোগ নিয়ে কাজ করার মতো জনবল ও দক্ষতা কোনোটাই ওই প্রতিষ্ঠানের নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি। তানজিব বলেন, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানও সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের আওতাধীন বাংলাদেশ ফাইন্যানশিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) নেতৃত্ব দিতে পারত। এখন জনগণের পাওনা টাকা পরিশোধ নিয়ে অনেকে বলাবলি করছে, যে সরকারি অর্থায়ন থেকে জনগণের পাওনা মিটিয়ে দেওয়া হোক- এ প্রসঙ্গ তুলে ব্যারিস্টার তানজিব উল আলম বলেন, জনগণের করের টাকা সরকারের কাছে আমানত।

একজনের লুটপাটের টাকা পরিশোধে আমি ট্যাক্স দিইনি, এটা সংবিধানবিরোধী। তাই এখন কোম্পানি আইন অনুযায়ী ওই কোম্পানিকে অবসায়ন করে যে অর্থ পাওয়া যায় তা দিয়ে পাওনা পরিশোধ করা যেতে পারে। ব্যারিস্টার তানজিব উল আলম আরও বলেন, পাওনা পরিশোধ করার ক্ষেত্রে যে লোকের ২০ হাজার টাকা পাওনা আছে- তাকে এক হাজার টাকা দেওয়া সম্ভব হলে, তাকে ওইটা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

কিন্তু কোনোভাবেই করের টাকায় এই পাওনা পরিশোধ করা যাবে না। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল ওয়াহেদ তমাল এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর ‘ডিজিটাল মনিটরিং’ এর ওপর জোর দেন।

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.