কাঠগড়ায় এমপিরা!

সাম্প্রতিক সময় যুবলীগের কমিটি নিয়ে ব্যাপক বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। গত বছর থেকে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছিল, সেই শুদ্ধি অভিযানে সবচেয়ে বেশি আ’ক্রা’ন্ত হয় আওয়ামী যুবলীগ। আওয়ামী যুবলীগের দক্ষিণের একাধিক নেতা ক্যাসিনো বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অভিযোগে আটক হন।

পরে তাদের যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এই সময়ে যুবলীগে কমিটি বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ওঠে, লাখ লাখ টাকা নিয়ে যুবলীগের বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু বাংলা ইনসাইডারের অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেখা যাচ্ছে, কমিটি নিয়ে যে বিতর্ক এবং যে কমিটি বাণিজ্য হয়েছে, সেগুলো সবই হয়েছে স্থানীয় এমপিদের সুপারিশ ও যোগসাজশে।

বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কোন কমিটি নিজেরা করেনি। এখন যে কুষ্টিয়া আওয়ামী যুবলীগের কমিটি নিয়ে বিতর্ক চলছে। কুষ্টিয়া যুবলীগ সভাপতির বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে এবং তাকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বলা হচ্ছে যে, যুবলীগের তৎকালীন নেতৃত্বে থাকা ওমর ফারুক চৌধুরী আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে কমিটি গঠন করেছিলেন।

কিন্তু আমাদের কাছে তথ্য প্রমাণ এসেছে যে, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলম হানিফ ২০১৭ সালে কুষ্টিয়া সদর আওয়ামী যুবলীগের কমিটির জন্য সুপারিশ করেছিলেন। যেভাবে সুপারিশ করা হয়েছিল ওমর ফারুক চৌধুরীর নেতৃত্বে তৎকালীণ কমিটি সেই সুপারিশকেই পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ণ করেছে।

২০১৭ সালে কুষ্টিয়া শহর যুবলীগের সুপারিশকৃত কমিটি:- আহ্বায়ক- মো. আশরাফুজ্জামান সুজন। যুগ্ম আহ্বায়ক- ১. মনিরুল ইসলাম বাবু, ২. আলি নিশান। সদস্য- ১. আবদুল আলীম, ২. ইমরান হোসেন দোলন, ৩. মাশরুল আলম মধু, ৪. রাকিবুজ্জামান সেতু, ৫. মেহেদি হাসান বাবুল, ৬. আবদুর রাজ্জাক হীরক,

৭. মোছা. মুন্নি, ৮. দেবাশিস দত্ত, ৯. সাব্বীর আহমেদ বিদ্যুৎ, ১০. কিশোর কুমার ঘোষ, ১১. এনামুল কবির লাভলু, ১২. মোহাম্মদ নাসিম, ১৩. সৌরভ হোসেন, ১৪. আনন্ত হোসেন, ১৫. রেজাউল করিম রেজা, ১৬. জিয়া সরদার, ১৭. আলিমুজ্জামান আলিম, ১৮. মাহাবুল ইসলাম।

সুপারিশকৃত এই কমিটি ঠিক একইভাবে একই সিরিয়ালে অনুমোদন দেওয়া হয়। একইভাবে রংপুরের কমিটির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য টিপু মুনশি লিখিত চিঠির মাধ্যমে একটি কমিটি গঠনের জন্য যুবলীগের তৎকালীন চেয়ারম্যানের কাছে অনুরোধ করেন। রংপুরে-৫ আসনের আরেক এমপি আশিকুর রহমানও রংপুর জেলা মিঠাপুকুর কমিটির জন্য সুপারিশ করেন। তারা যেভাবে এই সুপারিশ করেছিলেন সেভাবেই কমিটি বাস্তবায়িত হয়েছে।

আরেকটি চিঠিতে দেখা যায় যে, বর্তমান প্রতিমন্ত্রী বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান খুলনা মহানগর শাখার সভাপতি/ আহ্বায়ক এবং সাধারণ সম্পাদক/ যুগ্ন আহ্বায়ক মনোনয়ন প্রসঙ্গে ডিও লেটার দেন। এই ডিও লেটারের ভিত্তিতেই খুলনা যুবলীগের কমিটি গঠন করা হয়।

শুধু মুন্নুজান সুফিয়ান নন, খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ সালাউদ্দীনও খুলনা যুবলীগের মহানগরের কমিটি গঠনের জন্য ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। এভাবেই দেখা যায়, প্রায় অধিকাংশ জায়গাতেই স্থানীয় এমপিদের সুপারিশে যুবলীগের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এখন দেখা যাচ্ছে যে, আওয়ামী যুবলীগের নামে দৃর্বৃত্তায়ণ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক সময় ঘোরাঘাটের যুবলীগের যে উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক, তাকে সেখানকার ইউএনও’র ওপর হামলার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এই হামলার ঘটনায় আটক হওয়া আসাদুল ইসলামও যুবলীগের নেতা।

এসব কমিটি এবগ্ন ডিও লেটার থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, যুবলীগে যেসব অনুপ্রবেশকারী, সন্ত্রাসীরা প্রবেশ করছে- তারা প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে স্থানীয় এমপি এবং মন্ত্রীদের লিখিত সুপারিশের ভিত্তিতে। কুষ্টিয়া, খুলনাসহ যেখানেই যুবলীগের বিতর্কিত ব্যক্তিদের নাম আসছে, যাদেরকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে, তাদেরকে কমিটিতে আনার পেছনে যুবলীগের তৎকালীন নেতৃত্ব এককভাবে দায়ী নয়। বরং এমপিদের সুপারিশেই এদের কমিটিতে আনা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছে, এমপিরা নিজেদের ক্ষমতাকে পোক্ত করার জন্য প্রভাব বলয় বিস্তার করার চেষ্টা করে, এর প্রমাণ হলো এই কমিটিগুলো। স্থানীয় কমিটিগুলো গঠনে যদি এবারও এমপিদের কর্তৃত্ব থাকে এবং যাচাই বাছাই না হয় তাহলে নতুন কমিটিতেও এ ধরণের অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকতেই পারে।

এজন্য অঙ্গসহযোগী সংগঠনের কমিটিগুলোর ক্ষেত্রে কখনেোই এমপি এবং মন্ত্রীদের দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ এমপি-মন্ত্রীরা সুপারিশ করেন বটে, কিন্তু যখন অভিযোগ ওঠে তখন তারা দায় নেন না, দায় পড়ে ঐ সংগঠনের ওপর। এসবের প্রেক্ষিতে প্রশ্ন ওঠে, এই যে টাকার বিনিময়ে যুবলীগের কমিটি করার অভিযোগ উঠছে, এই টাকাটা কার পকেটে গেল?

অবশ্যই এর পেছনে যুবলীগের তৎকালীণ কেন্দ্রীয় কমিটির দায় আছে। কারণ একটা কমিটির সুপারিশ করা হলেই যাচাই বাছাই ছাড়া সেটা বাস্তবায়ন করা হবে, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এটা সমীচীন নয়। সুতরাং যুবলীগ নেতৃত্ব দায় এড়াতে পারে না, এটা ঠিক। সেই সঙ্গে এটাও ভাবতে হবে যে, এমপি মন্ত্রীরাই অন্যায়ের পেছনের কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন কিনা। সূত্র: বাংলা ইনসাইডার।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*