ক্রিকেট এবং ভূত : শিউরে ওঠার মতো সেরা তিনটি ভৌতিক ঘটনা

ক্রমাগত শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে বাংলাদেশের শহরগুলো তো কি, ইদানিং অনেক গ্রামেরও চিরচেনা রূপ বদলে যাচ্ছে। স্মার্টফোন, কম্পিউটার থেকে শুরু করে দ্রুতগতির ওয়াইফাই সংযোগ – আয়েশি জীবনের প্রায় প্রতিটি উপকরণই আজ গ্রাম বাংলায় প্রবেশ করেছে। অথচ অর্ধ শতাব্দী আগেও দৃৃশ্যপট এমন ছিল না। দেশের অনেক জায়গায় তখনো বিদ্যুত সংযোগ পর্যন্ত ছিল না।

সন্ধ্যা পেরোলেই বেশিরভাগ মানুষের ঘর থেকে নাক ডাকার শব্দ পাওয়া যেত। আবার মাঝেমাঝে বাড়ির সবাই মিলে গোল হয়ে বসে ভূত-প্রেতের গল্পের আসর বসাতেন। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত গ্রাম-গঞ্জে তখন মানুষেরা প্রায়ই অতিপ্রাকৃত বিভিন্ন ঘটনার সম্মুখীন হতেন। অবশ্য একুশ শতাব্দীতে এসে যে সেসব ঘটনা আর ঘটছে না, তা কিন্তু নয়।

মানুষ এখনো এসব বিষয় নিয়ে প্রচন্ড কৌতুহলী এবং সুযোগ পেলে এধরনের গায়ে কাঁটা দেওয়া গল্পগুলো শুনতে কান পেতে দেয়। মজার ব্যাপার হলো, শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং গোটা বিশ্বেই এমন অসংখ্য মানুষ আছেন যারা কখনো না কখনো ভয়ঙ্কর অস্বাভাবিক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন এবং স্বাভাবিকভাবে ক্রীড়াঙ্গনেও এমন অনেক ঘটনা নেহাত কম ঘটেনি।

বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেটের দুনিয়ায় প্রচলিত তেমনি তিন ভৌতিক ঘটনা নিয়েই থাকছে আজকের আয়োজন। আর হ্যাঁ, আগেই বলে রাখছি, প্রতিবেদনটি পড়ে যদি কারো রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়, তাহলে কিন্তু দোষ দিতে পারবেন না।

ল্যাংহাম হোটেল, লন্ডন: ইংলিশ স্থাপত্যশিল্পের অনন্য এক নিদর্শন লন্ডনের ল্যাংহাম হোটেল। ১৮৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বিলাসবহুল এই হোটেলটি গত দেড়শো বছর ধরে বিশ্বের নামকরা ব্যক্তিত্বদের সেবা দিয়ে আসছে। এমনকি আজকের দিনেও ল্যাংহাম হোটেল নিজের পুরোনো ঐতিহ্য এবং জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে।

যেকারণে খেলোয়াড়দের থেকে শুরু করে লন্ডনে সফরকারী প্রতিটি ভ্রমণপিপাসুদের জন্য ল্যাংহাম হোটেল সবসময়ই প্রথম পছন্দে রয়েছে। তবে ব্যাপক জনপ্রিয়তার পাশাপাশি হোটেলটিকে ঘিরে এপর্যন্ত জল্পনাকল্পনাও কম হয়নি। শোনা যায়, সেখানকার ৩৩৩ নম্বর রুমটি বেশ ভয়ঙ্কর। এনিয়ে বিবিসি রেডিওর ঘোষক জেমস এ্যালেক্সজেন্ডারের প্রত্যক্ষ করা একটি ঘটনা বেশ প্রসিদ্ধ।

হোটেলটির ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্যানুসারে, ১৯৭৩ সালের কোনো একরাতে তিনি কুখ্যাত ঐ রুমটিতে ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে হঠাৎ করেই তার ঘুম ভেঙে যায় এবং তিনি তার ঘরে একটি ফ্লুরোসেন্ট বাতির বল দেখতে পান। এরপর ধীরে ধীরে সেই বলটি একটি মানুষের অবয়ব ধারণ করে। যার পরনে ছিল তখনকার দিনের ‘ভিক্টোরিয়ান ইভিনিং ওয়্যার’।

জেমস তখন সাহস করে ভূতটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি চাও তুমি?’ তবে তার কথা শেষ না হতেই ভূতটি শূন্যে ভেসে ভেসে বারবার তার চারদিকে প্রদক্ষিণ করতে থাকলো এবং এক পর্যায়ে হাত-পা ছড়িয়ে বিভৎস রূপ ধারণ করে জেমসকে ভয় দেখাতে লাগলো। বেচারা জেমস নাকি সেসময় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে প্রাণপণে দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে সেযাত্রায় ভূতের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন।

তবে ল্যাংহামে এসব ভূতদের বিচরণ নাকি এখনো রয়েছে। ২০১৪ সালে হোটেলটি সম্পর্কে বেশকিছু অভিযোগ জানিয়েছিলেন স্টুয়ার্ড ব্রড, বেন স্টোকসদের মতো তারকারা। পরবর্তিতে হোটেল কর্তৃপক্ষকে অনেকটা বাধ্য হয়েই তাদের রুম পরিবর্তন করে দিতে হয়েছিল। তা ঠিক কোন কারণে তারা নিজেদের রুম বদল করিয়েছিলেন?

এমন প্রশ্ন করা হলে ব্রড উত্তরে ইংলিশ গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘শ্রীলঙ্কা টেস্ট চলাকালীন সময়ে আমাকে নিজের রুমটি পাল্টে ফেলতে হয়েছিল। কারণ রুমে এত গরম ছিল যে, আমি ঘুমাতে পারছিলাম না। এরমধ্যে হঠাৎ বাথরুমের সমস্ত ট্যাপ অকারণে খুলে গেল। আমি (বাথরুমের) লাইট জ্বালিয়ে দেখলাম ট্যাপগুলো একাকি বন্ধ হয়ে গেছে।

তারপরে আমি যখন লাইট বন্ধ করে দিয়েছিলাম তখন আবারো ট্যাপগুলো আপনাআপনি খুলে গেল। এটি খুব অদ্ভুত ছিল। তাই আমি ভয় পেয়ে নিজের রুম বদল করার জন্য হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করি। বিলেও (ব্রডের প্রেমিকা) এঘটনায় খুব ভয় পেয়েছিল এবং আমি জানতে পারি, মইন আলীর স্ত্রীও ভূতদের ব্যাপারে বেশ ভয়ে ছিলেন।

আমি চলতি টেস্টে (ভারতের বিপক্ষে) ঠিকমতো ঘুমিয়েছি। তবে শ্রীলঙ্কা টেস্টের সময় (গত মাসে) সেই সৌভাগ্যটি হয়নি। সেবার আরেকদিন যখন রাত দেড়টায় আমি জেগে উঠেছিলাম, তখন আমি নিশ্চিতভাবে ঘরে অন্য কারো উপস্থিতি টের পেয়েছিলাম।

এটি ছিল এক বিস্ময়কর অনুভূতি কেননা তিন তলায় থাকা বেন স্টোকসেরও ঘুমানোর সময় কিছু সমস্যা হয়েছিল। এমনকি সেখানেও (তিন তলায়) আমাদের সঙ্গে বেশকিছু অদ্ভুতুড়ে ব্যাপার ঘটেছিল আর আমি আপনাদের বলছি যে, সত্যিই ল্যাংহামে অন্যরকমের কিছু ছিল।’

ফিরোজ শাহ কোটলা, ভারত: বলা হয়ে থাকে, ভারতের রাজধানী দিল্লিকে এখন পর্যন্ত সাতবার ভেঙে, নতুন করে ঢেলে সাজানো হয়েছে। শতশত বাদশাহ, সম্রাট এখানে বসেই পুরো উপমহাদেশ শাসন করেছেন। কয়েক হাজার বছরের অসংখ্য অজানা রহস্য এখানকার মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। যেকারণে দিল্লিকে ঘিরে ভৌতিক কিংবদন্তিও কম শোনা যায় না।

বিশেষ করে, স্থানীয়দের মাঝে অনেকেরই ধারণা শহরটির পুরোনো অংশে অবস্থিত ফিরোজ শাহ কোটলা এলাকায় জ্বিনদের আবাস রয়েছে। শোনা যায়, প্রত্যেক বৃহস্পতিবার সেখানকার গলিতে জ্বিনরা জড়ো হন এবং একইসময় বেশকিছু মানুষ জ্বিনদের কাছে নিজেদের ইচ্ছাপূরণের জন্য অনুরোধ জানান।

যদিও ইসলাম ধর্ম অনুসারে জ্বিন সম্প্রদায়কে মহান আল্লাহ, মানুষের মতো করেই নিজের ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু এখনো বিশ্বের অনেক মানুষের ধারণা, অদৃশ্য এই জাতি মানুষের ইচ্ছাপূরণে সক্ষম। এমনকি অনেকে ফিরোজ শাহ কোটলায় স্বচক্ষে জ্বিনকে দেখার ব্যাপারে দাবি করে থাকেন।

তবে চমকে দেওয়ার মতো ব্যাপার হলো – যে এলাকাটাকে ঘিরে এতোরকমের ঘটনার সূত্রপাত, ঠিক সেখানেই ভারতের বিখ্যাত ফিরোজ শাহ কোটলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম। যেখানে অনীল কুম্বলে একবার এক ইনিংসেই দশটি উইকেট শিকার করেছিলেন। এখানেই গত নভেম্বরে বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো কোনো টি-টোয়েন্টি ম্যাচে জয় লাভ করেছিল।

আর স্থানীয় তরুণ ক্রিকেটাররা সবসময়ই এখানে ক্রিকেট চর্চা করে থাকেন। খেলায় বুঁদ হয়ে থাকতে থাকতে অনেক সময় রাতের আঁধারেও তাদের এই ভুতুড়ে রাস্তাগুলো দিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। একবার ভেবে দেখুন তো, বৃহস্পতিবারের রাতে যদি আপনাকেও কখনো নিস্তব্ধ এসব গলি দিয়ে যাওয়া-আসা করতে হতো, তাহলে কেমন লাগতো?

লুমলে ক্যাসেল হোটেল, চেস্টার-লে-স্ট্রিট, ডারহাম: এবারের ঘটনাস্থলও সেই ইংল্যান্ডেরই কোনো এক পুরোনো হোটেল। প্রায় ৬০০ বছর আগে ডারহামে এই লুমলে ক্যাসেল নামের দুর্গটি তৈরি করিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের এক বীর সৈনিক – র‌্যাল্ফ লুমলে। ইতিহাস অনুসারে, তিনি বেশ গোপনে তার প্রথম স্ত্রী লিলি লুমলের (যার প্রকৃত নাম-পরিচয় এখনো অজানা) সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন যা তখনকার ধর্মযাজকরা মেনে নিতে পারেননি।

এমনকি পরবর্তিতে লিলি ক্যাথেলিক ধর্মের অন্যান্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেও অস্বীকার করেন। ফলে একদিন ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে দুইজন ধর্মযাজক মিলে রাতের আঁধারে লিলিকে দুর্গের ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেন। আর তার স্বামী স্যার র‌্যাল্ফ লুমলেকে জানান যে, লিলি তার কৃতকর্মে অনুতপ্ত হয়ে সন্ন্যাসীনি হওয়ার জন্য অনির্দিষ্টকালের জন্য দুর্গ ছেড়ে চলে গেছেন।

তবে অনেকে দাবি করে থাকেন, এঘটনার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায়শই লিলির মতো দেখতে একজন নারীকে দুর্গের প্রাচীর এবং উপরের দেয়াল ঘেঁষে চলাফেরা করতে দেখা যায়। কেউ কেউ নাকি আবার হোটেল রুমগুলোর ভিতরেও তাকে দেখতে পেয়েছেন।

এরমধ্যে ভারতীয় জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির প্রত্যক্ষ করা একটি ঘটনার কথা না বললেই নয়। নেটওয়েস্ট সিরিজে ঐতিহাসিক জয় লাভের আগে একবার ভারতীয় দলকে ডারহামের সেই হোটেল লুমলে ক্যাসেলে থাকতে হয়েছিল। তো সেদিন মাঝরাতে হঠাৎ করেই বাথরুম থেকে ভেসে আসা পানির শব্দে সৌরভের ঘুম ভেঙে যায়।

আর শব্দের উৎস খুঁজতে খুঁজতে তিনি যখন বাথরুমের দরজা খুলেন, তখন দেখেন যে সেখানের সবগুলো পানির নলই কে জানি খুলে রেখেছে। প্রথমে কিছুটা হতভম্ব হলেও কলগুলো বন্ধ করে তিনি পুনরায় ঘুমাতে চলে যান। কিন্তু কিছুক্ষণ পর একই শব্দ আবারো তার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দেয়। এবার তিনি চোখ খুলতেই দেখেন, বাথরুমের লাইটটি জ্বালানো অবস্থায় রয়েছে এবং কোনো এক মহিলা পর্দার আড়ালে গান গাইতে গাইতে গোসল করছেন।

সৌরভ সেই দরজা পর্যন্ত পৌছালে, পর্দার আড়ালে থাকা মহিলা নিজের জ্বলজ্বল চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। পরক্ষণেই হুট করে পর্দাটি সরে যায় এবং সেখানে কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায় না। এবার লাইটগুলোও জ্বলতে-নিভতে শুরু করে আর সৌরভও সেই মহিলার জ্বলজ্বলে চোখগুলোকে ফের দেখতে পান।

এতোকিছু ঘটার পর সৌরভ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি এবং তিনি দৌড়ে তার পাশের রুমে থাকা সতীর্থ রবিন সিংয়ের কাছে ছুটে যান। পরেরদিন সকালে তারা জানতে পারেন যে, লুমলে ক্যাসেল একটি ভুতুড়ে হোটেল। শুধু তাই নয়, ২০০৫ এ্যাশেজের সময় প্রায় একইরকম ঘটনার শিকার হন অস্ট্রেলিয়ান জাতীয় দল সংশ্লিষ্ট অনেকে।

বিশেষ করে তাদের মিডিয়া ম্যানেজার পর্যন্ত সেবার বলেছিলেন, ‘আমি এখানে ভূত দেখেছি। আমি কসম খেয়ে বলছি যে, আমি সত্যি বলছি।’ এমনকি অস্ট্রেলিয়ান স্পিন জাদুকর শের্ন ওয়ার্নও তার সতীর্থ ব্রেট লির সঙ্গে রাতে ঘুমানোর সময় অদ্ভুতুড়ে কিছু ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলেন।

প্রিয় পাঠক, ভয়ের গল্প তো অনেক হলো। এবার নাহয় অভয়ের কিছু কথা বলি। ডারহামের সেই হোটেলে বাংলাদেশের জাতীয় দলও বেশ কয়েকবার অবস্থান করেছে। কিন্তু টাইগারদের সঙ্গে ভুতুড়ে ঘটনা ঘটা তো দূরের কথা, উল্টো মাশরাফিই একবার সেই হোটেলে রাত্রিবেলা ভূত সেজে নিজের সতীর্থ ও সিনিয়র ক্রিকেটারদের ভয় দেখিয়েছিলেন। আপনি চাইলে নিচের লিঙ্কে প্রবেশের মাধ্যমে সেই মজার ঘটনাটিও পড়ে দেখতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *