ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে হার ছিল এটাঃ পন্টিং

স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ ক্রীড়াঙ্গনের ৫০ গৌরব নিয়ে লিখতে গিয়ে পড়তে হল মধুর সমস্যায়। আর এই সমস্যাটা (!) মোহাম্মদ আশরাফুলকে নিয়ে। আমাদের কৃতি ক্রীড়াবিদদের একটি বড় অর্জন বাছতে খুব বেশি মাথা ঘামানোর প্রয়োজন পড়েনি।

কিন্তু তার বেলায় বিষয়টার কূল-কিনারা করাটা কঠিন হয়ে পড়ল। এ ভার তাই ছেড়ে দিলাম আশরাফুলের উপরই! খোদ আশরাফুলও বললেন, দুটো দুই রকমের! কোনটাকে এগিয়ে রাখবেন, তা নিয়ে তিনিও দোটানায়, “সবচেয়ে কম বয়সে টেস্ট সেঞ্চুরি যে রেকর্ডটি, তা এখনও টিকে আছে।

এটা আমার জন্য খুব বড় প্রাপ্তি। আবার কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো খুব বড় একটা ব্যাপার। কেননা, ওই সময়ে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা দল। আর ওয়ানডে ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওটাই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একমাত্র জয়।

আবার টেস্ট ক্রিকেটের একটা বিশ্বরেকর্ড আলাদা গুরুত্ব রাখেই।” এ দুটো ঘটনা বাদ দিলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। শুধু এটুকু বললে মোটেও সুবিচার করা হবে না আশরাফুলের প্রতি। দেশের ক্রিকেটের মনস্তত্ব বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই দুটো ঘটনার প্রভাব সুদুরপ্রসারী।

কার্ডিফে বাংলাদেশের কাছে হারের পর ওই সময় অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক রিকি পন্টিং বলেছিলেন, “এটা আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে হার। এটা সম্ভবত ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অঘটন।” হতাশ পন্টিং আরও বলেছিলেন, “আগামীকাল কোন পত্রিকা পড়ব না। আপাতত, এটাকেই আমাদের জন্য ভাল চিন্তা বলে মনে করছি।”

পত্রিকা পড়তে না চাওয়া মানে বাংলাদেশের কাছে হারের খবর কোনভাবেই দেখতে চাননি পন্টিং। আরও সহজ করে বললে, কার্ডিফ দুঃস্বপ্ন যেকোনো মূল্যে ভুলতে চান অসি অধিনায়ক। ওই সময়ের অস্ট্রেলিয়া দলের দিকে তাকালে পন্টিংয়ের এই হতাশা, মনোবেদনা অনুধাবন করাটা কঠিন কিছু নয়।

১৯৯৯ থেকে ২০০৭ টানা তিন ওয়ানডে বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া। সামনে যাকেই পাচ্ছে, তাকেই গুড়িয়ে দিচ্ছে। ওই সময়টাতে অস্ট্রেলিয়ানদের দাপট বুঝাতে গিয়ে পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খান বলেছিলেন, “অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দুটো অস্ট্রেলিয়া দল বিশ্বকাপে অংশ নিলেও বোধকরি ফাইনাল হবে অল অস্ট্রেলিয়ান।”

অনেকটা আকস্মিকভাবেই টেস্ট স্ট্যাটাস পায় বাংলাদেশ। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সেঞ্চুরির সুবাদে ভারতের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টকে স্মরণীয় করে রাখে স্বাগতিক বাংলাদেশ। কিন্তু এরপর থেকেই শুরু হয় সংগ্রাম। স্ট্যাটাস প্রাপ্তির যৌক্তিকতা প্রমাণের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখ পড়তে হয় বাংলাদেশকে।

প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে টেস্ট স্ট্যাটাস। অভিষেক টেস্টের সুখস্মৃতিও মিলিয়ে যেতে থাকে। এরকম একটা অবস্থায় ২০০১ সালের আগস্ট মাসে এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেয় বাংলাদেশ। প্রথম টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে দল হারল ইনিংস ও ২৬৪ রানের বিশাল ব্যবধানে। পরের টেস্টে প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা।

আগের সপ্তায় ভারতের বিপক্ষে তৃতীয় ও শেষ টেস্ট জিতে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছে লংকানরা। কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব মাঠে সিরিজ নির্ধারণী টেস্টে দুই ইনিংস মিলিয়ে ১১ উইকেট নিয়ে ভারতকে একাই শেষ করে দেন লংকান ঘূর্ণি জাদুকর মুত্তিয়া মুরালিধরন। ২৩ উইকেট নিয়ে সিরিজ সেরাও মুরালি।

সিংহলিজ ক্লাব মাঠেই মুরালি-চামিন্দা ভাসদের মুখোমুখি বাংলাদেশ। লংকান বোলিং বিশেষ করে মুরালির সামনে পড়লে আমাদের ব্যাটসম্যানদের কী হাল হবে, সর্বত্র এ নিয়েই আলোচনা। যেখানে মুরালিকে সামলাতে স্পিন স্পেশালিস্টখ্যাত ভারতীয় ব্যাটসম্যানেরাই গলদঘর্ম, সেখানে নাইমুর রহমান দুর্জয়দের কপালে কি শনি অপেক্ষা করছে, বড় হয়ে উঠল এ প্রশ্নটিই।

ভারতীয় ব্যাটসম্যানেরা স্পিন কেমন খেলে এ নিয়ে কিংবদন্তী লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্নের একটি মন্তব্য স্মরণ করা যাক। এই অস্ট্রেলিয়ান ঘুর্ণি জাদুকরের ভাষায়, “ভারতীয় ব্যাটসম্যানেরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্পিন খেলতে পারে।” ঘুর্ণি বিষের আসল ওঝা ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের পুরো সিরিজেই রীতিমতো কাদিঁয়ে ছাড়েন মুরালি।

তিন টেস্টে শিকার করেন ২৩ উইকেট। গড় মোটে ১৯. ৩০। কিন্তু হিসাবের বাইরেও হিসাব থাকে। এশিয়া টেস্ট চ্যম্পিয়নশিপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেরা একাদশে জায়গা পেলেন ১৬ বছরের কিশোর আশরাফুল। টস হেরে আগে ব্যাট করতে নেমে ৯০ রানে অলআউট বাংলাদেশ। মাত্র ১৩ রান খরচায় ৫ উইকেট তুলে নিলেন মুরালি।

তবে এ ধ্বংসস্তুপের মধ্যেও নিজেকে চেনালেন আশরাফুল। ইনিংস সর্ব্বোচ্চ ২৬ রান আসলো তারই ব্যাট থেকে। এ ইনিংসে বাংলাদেশ দলের আট জন পাননি দুই অংকের ঘরের নাগাল। জবাবে রানের সৌধ গড়ল লংকানরা। ৫৫৫/৫ নিয়ে ইনিংস ঘোষণা করলেন স্বাগতিক অধিনায়ক সনাথ জয়াসুরিয়া।

আর একটি লজ্জজনক হার, এর বেশি ভাবা সম্ভব ছিল না কারো পক্ষেই। তবে হারের আগে হারার পাত্র নন আশরাফুল। মুরালি ম্যাজিক বনাম আশরাফুল। জমে উঠল ব্যাট-বলের চিরন্তন লড়াই। আশরাফুল নামলেন ৬ নম্বরে। তখন বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে ৮১/৪। প্রথম ইনিংসের মত দ্বিতীয় ইনিংসেও শতরান আসবে কিনা, এ নিয়ে তখন ঘোর সংশয়।

খেলার মাঠে সবচেয়ে বড় সত্যি লড়াই। বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য এই সত্যটিকেই যেন নতুনভাবে স্মরণ করিয়ে দিলেন আশরাফুল। সঙ্গী বদল হচ্ছে, তবু হিমাদ্রির দৃঢ়তা নিয়ে লড়ে যাচ্ছেন এ টিন এজার। থামলেন ১১৪ রানে। এ ইনিংস খেলার পথে ক্রিকেট রেকর্ডের বইকে বড় ধরনের ঝাঁকুনিও দিলেন।

অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরির রেকর্ডকে নিয়ে গেলেন অন্য উচ্চতায়। সব চেয়ে কম বয়সে সেঞ্চুরিয়ানের মুকুট নিজের করে নিলেন আশরাফুল। চার দশক ধরে রেকর্ডটি ছিল পাকিস্তানের মুশতাক মোহাম্মদের দখলে। ১৯৬১ সালে দিল্লী টেস্টে স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে ১৭ বছর ৭৮ দিন বয়সে সেঞ্চুরী করে কনিষ্ঠতম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ানের মুকুট পরেছিলেনন মুশতাক।

১৭ বছর ৬১ দিন বয়সে সেঞ্চুরি করে মুশতাকের চার দশকের সৌধ নিজের করে নিলেন আশরাফুল। সেই থেকে কনিষ্ঠতম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ানের মুকুটটি এখনও শোভা পাচ্ছে তার মাথাতেই। দলের ইনিংস শেষ হল ৩২৮ রানে। হারও ইনিংস ব্যবধানে। তবে এসব কিছুই হয়ে গেল গৌন!

বাংলাদেশ ক্রিকেটকে একটা নতুন সম্ভাবনার উপর দাঁড় করালেন আশরাফুল। মুরালির সঙ্গে যুগ্মভাবে ম্যাচ সেরার স্বীকৃতি পেলেন তিনি। মুরালির সঙ্গে আশরাফুলের দ্বৈরথ ক্রিকেটেরই আরেক সৌন্দর্য। মুরালির দুর্বোধ্য অস্ত্র দুসরার সামনে নিয়মিতভাবে আত্মসমর্পন করেছেন বিশ্বের বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানেরা।

কিন্তু আশরাফুলের কাছে মুরলির দুসরা ছিল যথেষ্ঠই সহজবোধ্য। তার টেস্ট ক্যারিয়ারে ছয় সেঞ্চুরির পাঁচটিই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। ১৩ টেস্টে ৪৫.৩২ গড়ে ১০৯০ রান করেছেন। ক্যারিয়ার সর্ব্বোচ্চ ১৯০ রানের ইনিংসটিও তিনি খেলেছেন লংকানদের বিপক্ষেই। মুরালি-আশরাফুল দ্বৈরথটা আরেকটু ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

লংকান ঘূর্ণি জাদুকর তার শততম টেস্টটি খেলেছিলেন বাংলাদেশে। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে দুইটা মাইলফলকে নাম লেখান মুরালি। নিজের শততম টেস্টের ম্যাচে এক হাজারতম (টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে) উইকেট শিকার করেন এ লংকান। কিন্তু প্রথম দিনেই মুরালির শত–সহস্রকেও ছাপিয়ে গেলেন আশরাফুল।

উপহার দিলেন ১৩৬ রানের চোখ ধাঁধাঁনো ইনিংস। ম্যাচ জিতল লংকানরাই। দু ইনিংস মিলিয়ে মুরালি শিকার ৮ উইকেট। তবে ম্যাচ সেরার পুরস্কার পেলেন আশরাফুল। মুরালির ভয়ঙ্কর দুসরা স্বচ্ছন্দে মোকাবেলা প্রসঙ্গে আশরাফুল বলেন, “আমি বোলারদের হাত দেখে ব্যাট করি।

মুরালির হাতের দিকে নজর রাখলেই বুঝতে পারতাম, দুসরা ছুড়বে কিনা।” দুসরার বিপক্ষে টেকনিক প্রসঙ্গে জানালেন, “গনি (ওয়াহেদুল গনি) স্যারের একাডেমিতে প্র্যাকটিস করার সময় ইব্রাহিম সাগর নমের একজন অনেকটা দুসরার মত বল ছুঁড়তে পারত। এটা মুরালিকে খেলার সময় খুব ভাল কাজ দিয়েছে।”

শুধু মুরালি নয়, লংকান সব বোলারই তার বিপক্ষে ভাল করতে চাইত এই উত্তাপ টের পেতেন আশরাফুল, “কিছু কিছু বিষয় কিন্তু বোঝা যায়। মুরালি ছাড়াও মালিঙ্গা, ভাস মোট কথা সবাই আমার বিপক্ষে সফল হতে মরিয়া হয়ে উঠত। আমিও প্রস্তুত থাকতাম।” ২০০৫ সালের ১৮ জুন। বাংলাদেশে ক্রিকেটে সোনার অক্ষরে মোড়ানো এক দিন।

কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেনে আকাশে ওড়া অস্ট্রেলিয়াকে বাস্তবের জমিন দেখিয়েছিল বাংলাদেশ। আর এটা সম্ভব করেছিলেন আশরাফুল। ত্রিদেশীয় ন্যাটওয়েস্ট সিরিজে দ্বিতীয় ম্যাচে টস জিতে আগে ব্যাট করতে নেমে ৫ উইকেট হারিয়ে ২৪৯ রান সংগ্রহ করে অস্ট্রেলিয়া। জবাবে শুরুতেই পথ হারানোর যোগাড় হয় বাংলাদেশের।

৭২ রানে পতন ঘটে তৃতীয় উইকেটের। এরপর বাকিটা আশরাফুল মাহাকাব্য। অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমনের (৪৭) সঙ্গে চতুর্থ উইকেট জুটিতে যোগ করেন ১২৮ রান। এরপর আফতাব আহমদকে নিয়ে দলকে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন আশরাফুল। যতক্ষণে আউট হলেন, ততক্ষণে জয় বাংলাদেশের হাতের নাগালে।

মাত্র ১০১ বলের ইনিংসে ১০০ রান করে সাজঘরমুখো হন আশরাফুল। সাজানো ইনিংসটিতে বলকে ১১ বার সীমানাছাড়া করেন এই লিটল মাস্টার। জয়ের জন্য শেষ ১৭ বল থেকে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ২৩ রান। সহজেই সমীকরণ মিলিয়ে ফেললেন আফতাব। শেষ ওভারে জয় থেকে দুরত্ব ৭ রানের।

জেসন গিলেস্পির করা শেষ ওভারের প্রথম বলটিকে মিডউইকেট অঞ্চলের উপর দিয়ে শুন্যে ভাসিয়ে সীমানাছাড়া করলেন আফতাব। পরের বলে সিঙ্গেল নিয়ে ৪ বল হাতে রেখেই জয় নিয়েই মাঠ ছাড়লেন। মাত্র ১৩ বলের ইনিংসে ২১ রানে অপরাজিত থাকেন আফতাব। আর সেইসঙ্গে রাখেন আশারফুলের দুর্দান্ত ইনিংসটির মর্যাদাও।

কার্ডিফ জয়ের আগে ক্রিকেটের কুলীন দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের জয় ছিল কেবল পাকিস্তান ও ভারতের বিপক্ষে। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ ছিল, সেটা অনুধাবন করার জন্য দু-একটি তথ্যই যথেষ্ট। ২০০৩ বিশ্বকাপে সবগুলো ম্যাচেই ডুবতে হয়েছিল হারের লজ্জায়। কেনিয়া তো বটেই, হারতে হয়েছিল কানাডার বিপক্ষেও।

ওই একই বছর অস্ট্রেলিয়া সফর করেছিল বাংলাদেশ। ওই সফরের আগে বাংলাদেশকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করাটা অতিক্রম করল ভব্যতার সব সীমা। ডেভিড হুকস (অকাল প্রয়াত) নামের অস্ট্রেলিয়ান ভদ্রলোকটি দিলেন আজব এক তত্ত্ব।

বাংলাদেশকে এক দিনের মধ্যে টেস্টে হারিয়ে দেওয়ার জন্য স্টিভ ওয়াহর প্রতি আহ্বান জানালেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার হুকস। এ নিয়ে চলল বিস্তর কাঁটাছেড়া। দুই টেস্টের সিরিজের প্রথম টেস্ট গড়াল তৃতীয় দিনে। দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট চতুর্থ দিনে নিতে সমর্থ হল বাংলাদেশ।

ততদিনে একটা বিষয় পরিস্কার হয়ে গেছে যে, শুধু অংশগ্রহণের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বেশি দিন চলা যাবে না। ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দেওয়ার মত বড় একটা ঝাঁকির প্রয়োজন হয়ে দাঁড়াল ভীষণভাবে। কার্ডিফে সেটাই করলেন ২০ বছরের তরুণ আশরাফুল।

কার্ডিফ জয়ের পরের ম্যাচে ট্রেন্টব্রিজে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও খেললেন বিস্ফোরক ইনিংস। আশরাফুলের ব্যাট থেকে ৯৪ রান আসল মাত্র ৫২ বলের কনকর্ডে চড়ে। ১১ বাউন্ডারির সঙ্গে তিন তিনটি ছক্কার বুননে। ম্যাচে হার হলেও আশরাফুল বুঝিয়ে দিলেন একজন প্রমাণীত ম্যাচ উইনার পেয়ে গেছে বাংলাদেশ।

কার্ডিফে ম্যাচ শেষ হয়েছিল মধ্যরাতে। ওই সময় আমি দৈনিক সমকাল পত্রিকায় কর্মরত। পত্রিকার প্রথম সংস্করণ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। সাধারণত পত্রিকার দ্বিতীয় সংস্করণে অল্প কিছু লোক থাকে। এ দিন ঘটল ব্যাতিক্রম। সম্পাদক, সংবাদকর্মী থেকে শুরু করে অফিস স্টাফ সবার চোখ টিভি পর্দায়।

প্রথম ও শেষের পাতা পুরোটাই পাল্টে গেল। আমরা ক্রীড়া বিভাগের ছয় জনের ছয়টি লেখা ছাপা হল প্রথম পাতায়। ঢাকার আনন্দ উৎসবের খবর নিতে ওই মধ্যরাতেই ছুটলেন আলোকচিত্রী ও অন্য বিভাগের রিপোর্টাররা। আমাদের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার (প্রয়াত) বললেন, “আজ তোমাদের লেখা দেখি।

আমি লিখব কাল।” পরদিন ‘বার্তাকক্ষ যখন গ্যালারী’ শিরোনামে লিখলেন , আমাদের সম্পাদক। পন্টিং কেন পত্রিকা পড়তে চাননি, সেটাও পরিস্কার হয়ে গেল রাত পোহাতেই। বিশ্বের শীর্ষ মিডিয়াগুলোতে বাংলাদেশের জয়জয়কার। যতদুর মনে পড়ে গার্ডিয়ান পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, হয়ত অনেকদিনের জন্যই বাংলাদেশকে নিয়ে সমালোচনা বন্ধ হবে।

আশরাফুলের সৌজন্যে সংগ্রামের পথ থেকে লড়াই পর্বে উন্নীত হল বাংলাদেশ। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে প্রথম পর্ব থেকেই ভারতের বিদায়ঘণ্টা বাজাল টাইগাররা। দ্বিতীপর্বে (সুপার এইট) চেনারূপে ফিরলেন আশরাফুল। তার ৮৩ বলে ৮৭ রানে ভর দিয়ে ওই সময় র‌্যাঙ্কিংয়ে নাম্বার ওয়ান দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাল বাংলাদেশ।

এত সব অর্জনের সমান্তরালে আরেকটি নির্মম সত্যও ছিল। বাংলাদেশ ক্রিকেট এগুচ্ছে, কিন্তু আশরাফুল অচেনা থাকছেন প্রায়শই। খুবই অধারাবাহিক। কলকাতার প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজার লিখল, ঢাকায় অনেকেই বলে থাকেন, বছরে দুটো ঈদের মতই আশরাফুল বছরে দুটো ভাল ইনিংস খেলেন।

দলেও হয়ে পড়লেন অনিয়মিত। এরপর ২০১৩ সালে পাতানো ম্যাচের বিষ গিলে নির্বাসিত হলেন ক্রিকেট থেকে। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফিরলেও পুরনো আশরাফুলকে আর পায়নি বাংলাদেশ। এখানে একটা ব্যাক্তিগত প্রসঙ্গ টানছি। এক যুগেরও (২০০৮ থেকে ২০২০) বেশি সময় ধরে এফএম রেডিও-তে (রেডিও আমার) ‘আমার স্পোর্টস’ নামে সাপ্তাহিক প্রোগ্রাম করেছি।

বলা বাহুল্য, এই সময়টাতে মাঠের আশরাফুল এক রকম হারিয়েই (দলে অনিয়মিত এবং পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞা) গেছে। আর মজাটা ঠিক এখানেই। এক যুগে ছয় শতাধিক প্রোগ্রাম করেছি রেডিও’তে। এই স্পোর্টস প্রোগ্রামটা এসএমএস ভিত্তিক। এই এক যুগে আশরাফুলকে নিয়ে কোন এসএমএস আসেনি এমনটা একটিবারের জন্যও ঘটেনি!

মাশরাফি বিন মর্তুজা, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম , তামিম ইকবালদের নিয়ে অসংখ্যা মেসেজ এসেছে, তবে সবগুলোতে নয়। এ শো-য়ের বছর তিনেকের মাথায়, বিষয়টা অন এয়ারেই জানালাম। ক্রীড়াপ্রেমীরাও সবাই খুব মজা পেল। শো’টা ছিল দু ঘন্টার।

শ্রোতাদের কেউ কেউ মজা করে বলত, দাদা, এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, আশরাফুলকে নিয়ে কোন এসএমএস কিন্তু আসেনি। ভক্তদের হৃদয়ে আশরাফুল কোন জায়গাটাতে, সেটা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এ বিষয়ে আশরাফুল বললেন, “সবই আল্লাহর রহমত। হয়ত ভাল কিছু করেছি। ভাল কিছু করতে চেয়েছি।”

বাংলাদেশ ক্রিকেটে ‘আশার ফুল’ হয়ে এসেছিলেন আশরাফুল। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটে অনেক বসন্তের ফুল ফোটানো আশরাফুল কি শীতের ঝরা পাতার মত ঝরে গেলেন ? টেস্টে গড় ২৪ আর ওয়ানডেতে গড় ২২ .২৩। নামের প্রতি কতটা সুবিচার করতে পেরেছেন এ প্রশ্ন থেকেই যায়।

বিষয়টা স্বীকার করে নিয়েই আশরাফুল বললেন, “একজন ভাল ব্যাটসম্যানের গড় ৩৫/৪০ থাকা উচিৎ। এর দায় শুধু আমার একার নয়। ম্যানেজম্যান্টেরও কিন্তু দায় আছে। এডি বারলো, চন্ডিকা হাতুরুসিংহের মত কোচ পেলে আমার গড়ও ৩৫/ ৪০ থাকত বলেই বিশ্বাস করি।”

বয়স ৩৬। যাদের সঙ্গে শুরু করেছিলেন তাদের কেউই আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নাই। আর এটাকেই চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিচ্ছেন আশরাফুল। জাতীয় দলে ফিরবেন, সেই প্রত্যয় নিয়েই তৈরি করছেন নিজেকে। আশরাফুলের কথায়, “জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন নিয়েই নিজেকে প্রস্তুত করছি।

নিয়মিত জিম করছি। রিফ্লেক্স, আই সাইট, ভেতরের তাড়না-সব আগের মতই আছে। করোনাভাইরাসের কারণে এই দুটো বছর আমার খুবই ক্ষতি হয়ে গেল। এ সময়টা খেলতে পারলে লক্ষ্যপূরণে অনেকটায় এগিয়ে যেতে পারতাম।” বয়স পক্ষে নাই। বাস্তবতাও অনেক প্রতিকুলে।

তারপরও হাল ছাড়তে নারাজ আশরাফুল। খুব ভালভাবেই জানেন, দলে জায়গা করে নিতে হলে পেছনে ফেলতে হবে তারুণ্যকে। তার এই আকাঙক্ষ্যা হয়ত শুধুই কথার কথা হিসাবে দেখা যেতেই পারত। কিন্তু নামটা যে মোহাম্মদ আশরাফুল। উজান বেয়েই ‍যিনি গড়েছেন অবিশ্বাস্য সব কীর্তি!

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.