গণ পদত্যাগের শঙ্কায় বিএনপি!

মনোনয়ন বাণিজ্য নিয়ে বিএনপিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপিতে গণ পদত্যাগের শঙ্কা দেখা গেছে বলে বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে গতকাল এই গণ পদত্যাগের শঙ্কার কারণেই সবগুলো আসনের জন্যে মনোনয়ন ঘোষণা করতে পারেনি বিএনপি।

দুটি আসনের জন্য তারা মনোনয়ন ঘোষণা করেছে এবং দুটি মনোনয়নই টাকার বিনিময়ে দেওয়া হয়েছে বলে বিএনপির মধ্যে অভিযোগ উঠেছে। এই দুই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী অন্যরা জানিয়েছেন যে, লন্ডন থেকে টাকার জন্যে টেলিফোন এসেছিল, তারা টাকা দিতে পারেননি আর এই কারণেই তারা মনোনয়ন পাননি।

ঢাকার একটি আসনে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তিনি দীর্ঘদিন দলের কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় বলে অভিযোগ করেছে বিএনপির একাধিক নেতা। তারা বলেছেন যে, অতীতে তাঁর অপকর্ম আর দুর্বৃত্তায়নের কারণে বিএনপিকে অনেক মাশুল দিতে হয়েছে। এখন সেই সমস্ত দুর্নীতিবাজ এবং দুর্বৃত্তদের আবার মনোনয়ন দেওয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, বিএনপি তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসেনি।

অতীতে প্রচুর লুটপাত, দুর্নীতি করেছেন এবং এখন সেই টাকার মাধ্যমে মনোনয়ন কিনছেন, তাদেরকে দিয়ে বিএনপি কোন ইতিবাচক রাজনীতি উপহার দিতে পারবে না বলেই মনে করছেন বিএনপির অনেক নেতারা। মনোনয়ন বোর্ডের সভাতেও এই মনোনয়ন বাণিজ্য নিয়ে আলাপ আলোচনা হয়েছে এবং এই ধরণের টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন দেওয়া বিএনপির রাজনীতিকে সঙ্কটের মুখে ফেলবে বলেও বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য মন্তব্য করেছেন।

তবে প্রকাশ্যে এসব নেতারা মনোনয়ন বাণিজ্যের ব্যাপারে মুখ খুলতে নারাজ। বরং তারা বলছেন যে, এই ধরণের কোন মনোনয়ন বাণিজ্য হয়েছে বলে তাঁদের জানা নেই। বিএনপির অন্যতম শুভাকাঙ্ক্ষী এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রকাশ্যেই বলেছেন যে, যা রটে তা কিছুটা হলেও বটে। নিশ্চয়ই মনোনয়ন বাণিজ্য হয়েছে এবং সে কারনেই এই ধরণের ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

উল্লেখ্য যে, মনোনয়ন বোর্ডের যখন সভা চলছিল সেসময় ঢাকার একটি আসনের জন্য বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষ হয় এবং কয়েকজন সে সময়ে আহত হয়। এই ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে যে, দুই গ্রুপই তারেক জিয়াকে টাকা দেওয়ার জন্যে রাজি ছিলেন।

কিন্তু একটি গ্রুপ বেশি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং সেই ব্যক্তিই মনোনয়ন পাবেন বলে নিশ্চিত গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে দলীয় চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের সামনে। এই সময়ে প্রতিপক্ষের কয়েকজন বলেন যে, টাকা দিয়ে মনোনয়ন কেনা হয়েছে। এরা আসলে বিএনপি করেনা। এভাবেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং তা সহিংসতায় রূপ নেয়।

তবে বিএনপিতে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন থেকেই টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন দেওয়া একটি ওপেন সিক্রেট বলেই মনে করছেন বিএনপির অনেক নেতারা। নাম না প্রকাশ করার শর্তে বিএনপির একজন নেতা বলেছেন যে, আগেও বিএনপির রাজনীতিতে মনোনয়ন এবং টাকার খেলা হতো, তবে এতটা নোংরা ভাবে নয় এবং সব আসনে নয়।

আগে বিএনপির জনপ্রিয়তা দেখা হতো এবং কে কোন আসনে ভালো ফলাফল করতে পারবেন বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন, কোন এলাকায় কার অবস্থান কেমন ইত্যাদি বিচার বিবেচনা করে যাকে যোগ্য মনে করা হতো তাকে মনোনয়ন দেওয়া হতো।

কিছু কিছু জায়গায় অনেক বেশি ধর্নাঢ্য, ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্যে আগ্রহ প্রকাশ করতেন এবং এজন্যে তারা টাকা খরচ করতেও রাজি ছিলেন এবং তখন তারা দলীয় ফান্ডে মোটা অঙ্কের টাকা দিতেন। কিন্তু মনোনয়ন কেনাবেচা এবং টাকা নিয়ে একাধিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়ার সংস্কৃতি তারেক জিয়াই বিএনপিতে শুরু করেছেন এবং এটা মোটামুটি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে চলে গেছে।

বিএনপির নেতারা বলছেন যে, বিষয়টি অসহনীয় এবং মেনে নেওয়া সহজ নয়। বিশেষ করে তৃণমূলে যারা জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, নানারকম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ত্যাগ স্বীকার করেও আন্দোলন-সংগ্রামে থাকছেন তারা এই ঘটনাটিকে মেনে নিতে চাচ্ছেন না। এই মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণে বিএনপিতে একটি বড় ধরণের গণপদত্যাগের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ঢাকা-৫ আসনে যে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সেই মনোনয়নকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে ঢাকা-৫ আসনের অনেক নেতাকর্মী বিএনপি থেকে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। একই পরিস্থিতি অন্যান্য জায়গাতে তৈরি হবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে এবং সঙ্কটের আবর্তে ডুবে থাকা বিএনপি মনোনয়ন বাণিজ্য নিয়ে নতুন সঙ্কটের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে বলেও বিএনপি নেতারা স্বীকার করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *