গয়েশ্বর: সংখ্যালঘু বলেই অনাহুত বিএনপিতে!

রাজনীতি করতে গেলে কেবল নীতি, আদর্শবান হলেই চলে না, বিপুল কর্মীবাহিনী থাকলেই হয়না, সঙ্গে কর্তাদের বা মূল নেতৃত্বের আস্থাভাজন হতে হয়। মূল নেতৃত্বকে তোষামোদ করে নেতা হওয়ার তরিকা আজকাল রাজনীতিতে ভালোভাবেই চালু হয়েছে। এর মধ্যেও যারা বিরল ব্যতিক্রম তাঁদের একজন হলেন বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বিএনপির রাজনীতির শুরু থেকেই দলটির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বিএনপি যে ঘরানার রাজনৈতিক দল, ক্ষমতার গর্ভে জন্ম হয়ে কেবল ক্ষমতার হালুয়া-রুটি ভাগবাটোয়ারা করাই যে দলের লক্ষ্য এবং আদর্শ, সেই রাজনৈতিক দলের নেতা হয়ে হালুয়া-রুটির ভাগ পেয়েছেন খুবই কম। সবসময় তাকে ক্ষমতা কেন্দ্রের বাইরেই দেখা গেছে। একবার প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন- এই যা তাঁর প্রাপ্তি।

এছাড়া সারাক্ষণই তিনি রাজনীতিতে আলোচিত একজন নেতা, কিন্তু কি কারণে যেন বিএনপির আপন নন, বিএনপিতে তিনি এক ধরনের অনাহুত। এর কারণ কি তা নিয়ে কোন ব্যাখ্যা নেই। এই নিয়ে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের দুঃখবোধ কোন লুকোছাপা বিষয় নেই। প্রায় প্রকাশ্যেই তিনি এই নিয়ে নিজের দুঃখ এবং হতাশার কথা বলেন। কিন্তু তারপরেও তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন।

বিএনপির রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবেই সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াশীল এবং ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তির আশ্রয়নির্ভর। এই কারণেই বিএনপির রাজনীতিতে দেখা যায় স্বাধীনতাবিরোধী, উগ্র ডান এবং মৌলবাদী শক্তির দাপট। এর মধ্যে একজন সংখ্যালঘু ব্যক্তির বিএনপির নেতৃত্বে আসা সত্যি সত্যিই কঠিন কাজ। কিন্তু সেই কঠিন কাজটি করেছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

তবে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের সমালোচকরা মনে করেন যে, তিনি যোগ্যতায় এসেছেন না সংখ্যালঘু কোটায় এসেছেন তাও এক বড় প্রশ্ন। কারণ এরকম উগ্র ডানপন্থি এবং যাদের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রকাশ্য গোপন যোগাযোগ রয়েছে তাঁরা নিজেদেরকে উদার গণতান্ত্রিক দেখানোর জন্যে সংখ্যালঘুদের কোটা তৈরি করেন এবং সেই কোটায় কয়েকজনকে দলের নেতৃত্ব দেন, ক্ষমতায় এলে মন্ত্রীও বানান।

তেমনি কোটায় গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বিএনপির নেতা হয়েছেন কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন অনেকেই করে থাকেন। তবে যে যেই প্রশ্নই করুক না কেন বিএনপির রাজনীতিতে যারা নিরবিচ্ছিন্নভাবে বিচ্যুতিহীন তাঁদের মধ্যে অবশ্যই গয়েশ্বর চন্দ্র রায় একজন এবং রাজনীতির যে প্রচলিত ধারা যে নেতার মন জয় করা, নেতাকে খুশী করা- সে ধরণের কাজে তিনি খুব একটা আগ্রহী নন, পারদর্শীও নন।

সেক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে, বিএনপির নেতৃত্বের সঙ্গে চাটুকারিতা না করেও কেবলমাত্র নিজের আদর্শিক অবস্থান বজায় রেখেই গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এই পথটুকু এসেছেন। এই পথে আসতে গিয়ে তাকে যে কাঠখড় পোহাতে হয়নি তাও নয়। কিন্তু এই কাঠখড় পোহানো, দলে তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা থাকার পরেও তিনি কখনো দলের যারা মূল নেতা তাঁদের বিশ্বস্ত এবং আস্থাভাজন হতে পারেননি। কেন পারেননি সেটাও একটি বড় প্রশ্ন।

২০০৭ সালের পর থেকে আসলে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় রাজনীতির পাদপ্রদীপে আসেন। এসময় তিনি সংস্কারপন্থীদের বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অবস্থান আর ২০০৯ এর পর থেকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে তাঁর খোলামেলা বক্তব্য দলে তাকে জনপ্রিয় করেছে।

যেমন ২০১৮ এর নির্বাচন নিয়ে বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে ঐক্য নিয়ে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কথা বলেছেন খোলামেলা, কোন রাখঢাক না রেখেই। বিএনপির মধ্যে অল্প কজন যে নেতারা আছেন যারা কর্মীদের মনের কথা বলেন এবং এই সমস্ত কথা বলতে গিয়ে পূর্বাপর চিন্তা করেন না যে তাঁর পদ থাকবে কি থাকবে না-

এরকম আতঙ্কে না ভুগেই অকপটে সত্য কথা বলার সাহস যে কজন নেতার আছে তাঁদের মধ্যে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় অন্যতম। আর সংখালঘুতার জন্যে হয়তো গয়েশ্বর চন্দ্র রায় হয়তো বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়েছেন, আর সংখ্যালঘু বলেই স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়ার পরেও বিএনপিতে অনাহুত গয়েশ্বর। সূত্র: বাংলা ইনসাইডার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *