নিজেদের ক্রমশ মেলে ধরছেন তারা

টানা তিন মেয়াদসহ মোট চার মেয়াদে ক্ষমতায় আছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চার মেয়াদের মন্ত্রিসভার মধ্যে গত বছরের ৭ জানুয়ারি যে মন্ত্রীসভা গঠন করা হয়েছে সেই মন্ত্রিসভা নিয়ে সবথেকে বেশি সমালোচনা হচ্ছে। সরকার দেড় বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে, এই সময়ে নানা ধরণের স’ঙ্কট মোকাবেলায় মন্ত্রীদের অনেককেই অস্থির, অযোগ্য এবং দায়িত্বহীন মনে হচ্ছে।

এ নিয়ে সরকারের ভেতরে-বাহিরে সমালোচনা হচ্ছে। এবার মন্ত্রিসভা গঠন করে সবথেকে বড় চমকটি দিয়েছিলেন। অধিকাংশ সিনিয়র নেতাদেরকে তিনি বসিয়ে রেখেছেন, মন্ত্রিসভায় স্থান দেননি। মন্ত্রিসভায় এনেছেন একাধিক নতুন মুখ, যাদেরকে প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভায় সুযোগ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুর্ভাগ্য হলো, শেখ হাসিনা অনেককেই সুযোগ দেন, কিন্তু তারা সুযোগগুলোকে কাজে লাগাতে পারেন না।

এবারের মন্ত্রিসভার অধিকাংশ নতুন মন্ত্রী সুযোগগুলোকে হেলায় নষ্ট করছেন। তারা মনে করছেন মন্ত্রিত্ব মানে শুধু একটি গাড়ি, একটি বাড়ি এবং মন্ত্রণালয়ে বসে কিছু ফাইল দেখা। মন্ত্রিত্ব যে একটি নীতিনির্ধারক অবস্থা সেটাই অনেকে বুঝতে পারছেন না।

তবে এই ব্যর্থতার ভিড়ে প্রথমবার হওয়া কয়েকজন মন্ত্রী নিজেদেরকে ক্রমশ উজ্জ্বল করছেন। বিশেষ করে করো’না সঙ্ক’টের সময় কয়েকজন মন্ত্রীর তৎপরতা জনগণের মধ্যে আশা জাগাচ্ছে এবং ব্যর্থতার ভিড়ে তারা কিছু একটা করার চেষ্টা করছেন, দায়িত্ব পালনের জন্য উদ্যম দেখাচ্ছেন।

তাদের এই ভূমিকাটা সাধারণ মানুষ লক্ষ্য করছে এবং শেখ হাসিনা তাদের উপর যে আস্থা রেখেছিলেন, সেই আস্থার প্রতিদান দিচ্ছেন। ব্যর্থতার ভিড়ে কিছু আশার আলো দেখা যাচ্ছে। প্রথমবার হওয়া কয়েকজন মন্ত্রী, যারা ধীরে ধীরে নিজেদেরকে মেলে ধরছেন তাদের কয়েকজনকে নিয়েই এই প্রতিবেদন-

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম: তাজুল ইসলামের মন্ত্রী হওয়াটা ছিল এবারের সবথেকে বড় চমক। সাধারণত এই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়ার রীতি ছিল দলের সাধারণ সম্পাদককে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এই রীতি প্রথমবারের মতো ভাঙেন। তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে হটিয়ে ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন।

এবারও তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেননি, বরং আনকোরা তাজুল ইসলামকে এই দায়িত্ব দিয়ে সবাইকে রীতিমতো চমকে দেন। তাজুল ইসলাম প্রথমদিকে আনাড়িপনা করেছেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভুলত্রুটি করেছেন। কিন্তু ক্রমশ নিজেকে তিনি মেলে ধরছেন এবং তার মধ্যে পরিশ্রম, নিষ্ঠা এবং কাজ করার তীব্র স্পৃহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এবার তিনি শুরু থেকেই ডে’ঙ্গু মোকাবেলার জন্য কাজ করছেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হিসেবে যে সমস্ত স্থানীয় প্রতিনিধিরা ত্রাণ আত্মসাৎ বা দুর্নীতি করছেন- তাদের বি’রুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে ন্যূনতম কার্পণ্য করছেন না। একটু সচল এবং সদাতৎপর মন্ত্রী হিসেবে তিনি ইতিমধ্যে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন।

দু’র্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান: দু’র্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমানের মন্ত্রিত্ব পাওয়াটা ছিল বিস্ময়কর। কিন্তু করো’না এবং সাম্প্রতিক সময়ে আম্ফানের দু’র্যোগে তার ভূমিকা ছিল লক্ষ্যণীয়। তিনি আন্তরিকভাবে কাজ করছেন, যদিও ত্রাণ বণ্টন নিয়ে প্রচুর অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তবুও তার মন্ত্রণালয়কে তিনি দুর্নী’তির বাইরে রেখেছেন এবং এই মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোন অনিয়মের অভিযোগ ওঠেনি।

ত্রাণ বন্টনে যে অভিযোগগুলো উঠেছে তা সবই বণ্টন পর্যায়ে এবং জনপ্রতিনিধি পর্যায়ে। মন্ত্রণালয় মোটামুটি সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করেছে এবং প্রথমবারের মতো প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে এনামুর রহমান নিজেকে দু’র্নীতি থেকে দূরে রেখেছেন এবং আন্তরিকতার যে তার মাঝে কোন ঘাটতি নেই সেটা প্রমাণে সক্ষম করেছেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম: শ ম রেজাউল করিম প্রথমবার মন্ত্রিত্ব পেয়েছিলেন গৃহায়ন এবং গণপূর্ত মন্ত্রাণালয়ের। এরপরে এক দমকা হাওয়ায় তিনি গৃহায়ন এবং গণপূর্ত মন্ত্রাণালয়ের দায়িত্ব হারান এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। এই মন্ত্রণালয় যেন তার জন্যে শাপেবর হয়েছে।

করো’না সঙ্ক’টের সময় ডেইরি শিল্প, পোল্ট্রি শিল্পকে বাঁচানোর জন্য তার যে বিভিন্ন উদ্যোগ, সেই উদ্যোগগুলো প্রশংসিত হয়েছে। কাটাবন এলাকায় পশু-পাখির দোকানগুলোতে বন্দি হয়ে থাকা পোষা পশু-পাখিদের নিয়ে যে একটি করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, তখন তিনি নিজেই কাটাবন এলাকায় যান এবং সেই আটকে পড়া পশু-পাখিদের খাবার দেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশ দেন। শ ম রেজাউল করিম তার সেক্টরে যেন করো’নায় ক্ষ’য়ক্ষ’তি না হয় সেজন্য সদা তৎপর। নিয়মিত কাজ করছেন এবং তার এই আন্তরিকতা এবং তৎপরতা সাধারণ মানুষকে আশান্বিত করেছে।

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল: জাহিদ আহসান রাসেল দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করলেও তিনি এবারই প্রথম প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী হয়েই তিনি প্রত্যেকটি বিষয়ে তাকে শুরু থেকেই তৎপর দেখা যাচ্ছিল। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে তিনি একটি সচল মন্ত্রণালয় করার চেষ্টা করেছেন। করোনাকালে তাকে আরো উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত এবং কর্মতৎপর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দেখা গেছে।

এভাবে এই প্রথমবারের মতো হওয়া কিছু মন্ত্রীরা নিজেদের মেলে ধরছেন। তারা ক্রমশ বুঝতে পারছেন যে, মন্ত্রিত্ব একটি দায়িত্ব এবং জনগণ তাদের বিচারক। শেখ হাসিনা তাদেরকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, সেই দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করা যে অত্যন্ত জরুরী সেটা তারা বুঝতে পেরেছেন। এজন্যই ক্রমশ তারা উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন। ব্যর্থতার ভিড়ে এমন কয়েকজন মন্ত্রীর আন্তরিকতা, প্রচেষ্টা এবং নিষ্ঠা জনগণের প্রশংসা কুড়াচ্ছে।সূত্র: বাংলা ইনসাইডার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *