প্রধানমন্ত্রী জানেন, না কি জানেন না?

আমার জানার গণ্ডি একেবারেই কম, গাদা গাদা তথ্য নেই বললেই চলে। তবে কৌতুহলি মন বার বারই যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠে, কিছু বলতে চাই, বলা উচিত সেই চিন্তা মাথাতে ঘুরপাক খায়। কিন্তু পাছে কে কি বলে সেটা ভেবেই থেমে যেতে হয়, যে মানুষ পরিবারকে একটা কথা বলতে ১০০ বার ভেবে ভেবে শেষে নিশ্চুপ হয়ে যাই,

সে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে কিছু জানানোর চেষ্টা করবে আর সেটি উপযুক্ত মানুষটিই পড়বে এটা আশা করা হয়তো মিথ্যা মরীচিকার পেছনে ছোটা ছাড়া আর কিছুই নয়। তবুও বলা, সেটা তাঁর কাছ পর্যন্ত যাক বা না যাক। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয়তে প্রকাশিত কলামে আবদুল মান্নান সাহেবের লেখায় একটি মন্তব্যতে আমার মনে এসব চিন্তার উদ্রেক হলো।

প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে তিনি এক জায়গায় লিখেছেন, ‘তিনি হয়তো এটি উপলব্ধি করতে পারেন না, তাকে বর্তমানে এক দল কাছের মানুষ অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন। চাইলেই আমার মতো কেউ দেখা করতে পারেন না। এটি শুধু আমার কথা নয়; তার অনেক গুণমুগ্ধ, সুহৃদ ও শুভাকাঙ্ক্ষীর কথা। তাদের মধ্যে এমন মানুষও আছেন, যাদের তিনি অসম্ভব শ্রদ্ধা করেন।’

বরাবরই কৌতুহল জাগে, আচ্ছা আমরা সাধারণ মানুষ যা জানি প্রধানমন্ত্রী কেনো জানেন না, তাহলে কি তিনি জেনেও চুপ থাকেন? আবদুল মান্নান সাহেবের এই লেখা পড়ে দীর্ঘদিনের কৌতুহল যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। শুনেছি, প্রাণপ্রিয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ পর্যন্ত নাকি দেশের অনেক সঠিক ও সত্যি পরিস্থিতির আসল রূপ গিয়ে পৌঁছায় না, সব ফিল্টার করা তথ্যই নাকি তার কাছে পেশ করা হয়।

মনে কৌতুহল জাগে, দেশের সর্বময় ব্যক্তি হয়েও তিনি কি তাহলে কিছুই আঁচ করতে পারেন না? এ কথা অবশ্য আমি মানি যে, সব সমস্যার সমাধান করা বা খুঁটিনাটি অনেক কিছু করার সীমাবদ্ধতা তাঁর আছে। দেশের কোটি কোটি মানুষের অগণিত সমস্যা তার একার পক্ষে সমাধান করার আশা করাটাও নিতান্তই মূর্খতার পরিচয় ছাড়া কিছুই না। তবু মনে এই প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রী আসলেই কি গণমানুষের কথা জানেন না?

আর যদি জানেনই, তাহলে একটু একটু করে হলেও কেনো সত্যিকারের কোনো সমাধান আসে না। যখন একটা কিছু ভাইরাল হয়, সেটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়, অনেক জল ঘোলা হয়, তারপর হয়তো সেটি তার নজরে আসে বা সেই বিষয়ে তাঁর কোনো দিক নির্দেশনা আসে। তারপরও দেখা যায়, সেটির পদক্ষেপ নিতেই হাজারো সাজানো নাটকগুলোই শুধু সমাধানের তালিকাতে স্থান পায়?

তার উপর আছে, কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের স্বার্থ উদ্ধারের নোংরা খেলা। এই যে দেখুন, এই করোনাকালে যে পরিমাণ ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে তাতে অধিকাংশ সমস্যা মিটে যাওয়ার কথা, কিন্তু আদতে শুধু ত্রাণ বিলিয়ে ফটোসেশন আর নাম কামানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করেছি একজন গণমাধ্যম কর্মী হওয়ার সুবাদে।

শেখ হাসিনার অবর্তমানে দেশের হাল স্বার্থহীনভাবে ধরবে এমন আস্থাভাজন মানুষের সন্ধান আমার মতে এখনো মেলেনি। এই যে এত এত ক্ষমতা দখলের অপপ্রতিযোগিতা, কারো ভেতর কি দেশ বাঁচানোর চিন্তা আসে, দেশের মানুষকে রক্ষা করার ইচ্ছা জাগে? যদি তাই জাগতো তাহলে হয়তো এত লুটপাট আর ক্ষমতাগ্রাসের প্রতিযোগিতা বন্ধ হতো। এসব লোভে কিছু গোষ্ঠী আর মুষ্টিমেয় জনগণ লাভের উপর লাভবান হচ্ছে, হবে।

আর বেশিরভাগ মানুষ জীবনের সাথে যুদ্ধ করে করে অপ্রাপ্তি আর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মরে যাবে। আমি ভাবি, কি হবে এই ক্ষমতা দিয়ে যেখানে মুষ্টিমেয় মানুষের পেট মোটা হবে, তারা অট্টালিকায় থাকবে আর বাড়তিটুকু জমিয়ে পচিয়ে সিন্দুকে জমাবে, দেশের বাইরে নিজের জন্য আরেক অট্টালিকা গড়বে।

অথচ একই দেশের জনগণ হয়ে অধিকাংশ মানুষ জীবনের সাথে যুদ্ধ করে করে প্রতিটা দিন পার করবে? ক্ষুধার জ্বালায় আর ঘরের অভাবে পশুপাখির মত দিন কাটাবে? আমার একটাই চাওয়া, প্রধানমন্ত্রী সব জানুন, সবটা না পারলেও খানিকটা দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরুন। এই দেশটা আমার, আমাদের হয়েই থাকুক।

দেশ বাঁচলে আমাদের ঠিকানা থাকবে, আর আমাদের এই ঠিকানাটা স্বর্গের মতই হোক। আমার দেশটাই স্বর্গের মতোই নিরাপদ, এই নিরাপত্তাবোধটুকুই সহায় হোক সকলের। একজন খেয়ে, আরেক জন না খেয়ে ড্রেনের পাশে না ঘুমাক। প্রতিটা মানুষ ভালো থাক, আর অন্যজন ভালো আছে এই নিশ্চয়তাটুকু বাস্তবতা পাক।

রাজনৈতিক পরিবারেই আমার বেড়ে ওঠা, তবুও এই রাজনীতি ব্যাপারটাতে ছোটবেলা থেকে কেন যেন অরুচি লাগে। তবু যখন কিছুই বুঝতাম না, তখন থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বেশ ভালো লাগতো। প্রধানমন্ত্রী কি জিনিস সেটা বোঝবার ক্ষমতা তখনো হয়নি, কিছু পোস্টার আর টিভির পর্দায় তার মুখটা দেখে আর কথা শুনেই ভালো লেগেছে।

এরপর আস্তে আস্তে বয়স-বুদ্ধি ও জ্ঞান বাড়ার সাথে সাথে তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ অনেক বেড়ে গেছে। অন্তত এতটুকু বোঝার ক্ষমতা হয়েছে তার মতো কঠোর এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্বের নেত্রী খু্ব কমই আছেন। তিনি আমাদের দেশের মতো এমন একটি দেশে না জন্মে যদি উন্নত কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী হতেন, তবে তার বিরুদ্ধে সমালোচনা থাকতো না বলেই আমার বিশ্বাস।

কিন্তু তার দুর্ভাগ্য দুর্নীতিপ্রবণ জনগণ আর সীমাহীন সমস্যা মাথায় নিয়ে চলা একটি দেশের ভার তার কাঁধে। তবুও একটু একটু করে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন সম্মানের সাথে। কিন্তু ভাবতে কষ্ট লাগে, তিনি কেমন করে এগোবেন, তার দলে ব্যাঙের ছাতার মত স্বার্থান্বেষী মানুষ ঢুকে পড়েছে, যারা আওয়ামী লীগ করেন শুধুমাত্র ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আখের গোছানোর জন্য।

জনগণের কল্যাণে যে নীতি সেটাই মূলত রাজনীতি, এই মূল কথাটা বুকে ধারণ করে রাজনীতি করছেন না একটা বিশাল সংখ্যক নেতাকর্মী। সবাইকে ঠিক করা একা একজন মানুষের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমার কেন জানি না মনে হয়, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভালো সিদ্ধান্তের ব্যাপারে খুব একরোখা।

তাতে হাজার সমালোচনা হলেও তিনি সেই অবস্থানে হিমালয়ের মতো অনড় থাকেন। দলের সমস্ত অপকর্মের ঘানি নিজের কাঁধে নিয়ে তবু দেশের কল্যাণে তিনি একাই হেঁটে যাচ্ছেন। তার আসলে পাওয়ার কিছু নেই, পরিবার হারানো একটা মানুষের কি-ইবা আর চাওয়ার থাকতে পারে। তবুও দলের প্রতারক লোভী লোকগুলোর জন্য তার উপরও আস্থা হারাচ্ছে জনগণ।

প্রিয় নেত্রী, আপনার অবর্তমানে এই দেশের হাল ধরার মতো আর কেউ নেই। কেউ নেই যে আপনার মত লোভহীন হয়ে সত্যি দেশের জন্য কিছু করবে। অজস্র সমস্যায় থাকা এই দেশ নিয়ে আপনি যে পথ পাড়ি দিচ্ছেন তা সত্যিই বড় চ্যালেঞ্জের। আপনি যতদিন বেঁচে আছেন দেশটাকে আরেকটু গড়ে দিন দয়া করে। যাতে পরবর্তী প্রজন্ম আপনার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো আপনার পথও অনুসরণ করতে পারে।

দেশ নিজস্বতা নিয়ে বাঁচুক, দেশের জনগণ গর্ব করে যেন বলতে পারে বাংলাদেশের সন্তান আমি। দল বাঁচাতে লোভীদের আর ছাড় দেবেন না দয়া করে, দেশের জন্য বরাদ্দ অর্থে জনগণ সত্যি হেসে খেলে বাঁচতে পারতো যদি দুর্নীতি না থাকতো। আপনি দল নয়, দেশকে বাঁচান অনুগ্রহ করে। দেশ বাঁচলে, দল বাঁচবে। আমার বিশ্বাস, আপনার মতো কড়া হাতে এই হাল আর কেউ ধরতে পারবে না।

আপনার কাছে আমার এই আর্জি যাবে কি না জানি না, তবুও বলা। আপনার দীর্ঘায়ু আর সুস্থতা কামনা করি। আর চাই আপনার হাত ধরে দেশ এগিয়ে যাক, আর উন্নত দেশের মতো সব নিয়ম কানুন আমাদের দেশেও হোক। যাতে এ দেশের কেউ অনাহারে আর বাসস্থানবিহীন না থাকে। সবার সুস্থ-সুন্দরভাবে বেঁচের থাকার নিশ্চয়তা থাক।লেখক : প্রান্তী সারোয়ার। গণমাধ্যমকর্মী। সূত্র: সময় সংবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *