বাংলাদেশে আঘাত হানা ভয়ঙ্কর সব ঘূর্ণিঝড়

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এ দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। দরিদ্র থাকার অন্যতম একটি কারন হচ্ছে, ঘূর্ণিঝড়। সমুদ্র উপকূলে অবস্থানের কারণে ঝড়-সাইক্লোন-জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় পতিত হয় বাংলাদেশ। ৭০’র প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ৩১টি ঘূর্ণিঝড়ে মানুষের জীবনহানি ঘটেছে সাড়ে ছয় লাখেরও বেশি।

এক নজরে বাংলাদেশে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়…

বাকেরগঞ্জ ঘূর্ণিঝড়: প্রাণহানী ও ভয়ংকরের দিক থেকে পৃথিবীর ঘূর্ণিঝড়ের ইতিহাসে ষষ্ঠ স্থান দখল করে আছে বাকেরগঞ্জ ঘূর্ণিঝড়। ১৮৭৬ সালের ৩১ অক্টোবর বাকেরগঞ্জের উপকূলের উপর দিয়ে বয়ে যায় এই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়। এটি ‘দ্য গ্রেট বাকেরগঞ্জ ১৮৭৬’ নামেও পরিচিত।

এ সময় মেঘনার মোহনা এবং চট্টগ্রাম, বরিশাল ও নোয়াখালী উপকূলে তীব্র ঝড়ো জলোচ্ছ্বাস ও প্লাবন সংঘটিত হয়। ঘূর্ণিঝড়ে বাকেরগঞ্জের নিম্নাঞ্চল সম্পূর্ণভাবে প্লাবিত হয়ে যায়। ঝড়ে আক্রান্ত ছাড়াও ঝড় পরবর্তী বিভিন্ন অসুখ ও অনাহরে মানুষ মৃত্যুবরণ করে। আনুমানিক ২ লাখ মানুষের প্রাণহানী ঘটে এই ঘূর্ণিঝড়ে। এরও বেশি মানুষ মারা যায় দুর্যোগ পরবর্তী মহামারী এবং দুর্ভিক্ষে।

ভোলার ঘূর্ণিঝড়/ গোর্কি: ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানে এ ঘূর্ণিঝড়। এ পর্যন্ত রেকর্ডকৃত ঘূর্ণিঝড়সমূহের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ এবং সর্বকালের ভয়ংকরতম প্রাকৃতিক দুর্যোগের একটি। এ ঝড়ের কারণে প্রায় ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। যার অধিকাংশই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের সমুদ্র সমতলের ভূমিতে জলোচ্ছ্বাসে ডুবে মারা যান। এটি সিম্পসন স্কেলে ‘ক্যাটাগরি ৩’ মাত্রার ঘূর্ণিঝড় ছিল।

ঘূর্ণিঝড়টি ৮ নভেম্বর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয় এবং ক্রমশ শক্তিশালী হতে হতে এটি উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১১ নভেম্বর এর গতিবেগ সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটারে (১১৫ মাইল) পৌঁছায় এবং সে রাতেই উপকূলে আঘাত হানে। জলোচ্ছ্বাসের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপসমূহ প্লাবিত হয়। এতে ওইসব এলাকার বাড়ি-ঘর, গ্রাম ও শস্য স্রোতে তলিয়ে যায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ছিল তজুমদ্দিন উপজেলা। সেখানে ১ লক্ষ ৬৭ হাজার অধিবাসীর মধ্যে ৭৭ হাজার প্রাণ হারায়।

ম্যারিএন: নিহতের সংখ্যা বিচারে এ ঘূর্ণিঝড়টিও ছিল ভয়াবহ। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে এটি আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হয়। এর ফলে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারান।

প্রায় ১ কোটি মানুষ সর্বস্ব হারান। সিম্পসন স্কেলে ঝড়ের মাত্রা ছিল ‘ক্যাটাগরি-৫’। ঝড়ে সন্দ্বীপ, মহেশখালী, হাতিয়াসহ অন্য দ্বীপগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে। নিহতদের বেশির ভাগই ছিল শিশু ও বৃদ্ধ। ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ের পর অনেক সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হলেও সচেতনতা ও অজ্ঞতার কারণে অনেকেই সেখানে আশ্রয় না নেয়ায় এ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ঝড়ে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলারের (১৯৯১ মার্কিন ডলার) ক্ষতি হয়। বন্দরে নোঙর করা বিভিন্ন ছোটবড় জাহাজ, লঞ্চ ও অন্যান্য জলযান নিখোঁজ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ১০ লাখ ঘড়বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এতে ১ কোটি মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পড়েন।

সিডর: ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে ২৬০ কিলোমিটার বেগের বাতাসের সঙ্গে ১০ থেকে ১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস নিয়ে আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’। শ্রীলঙ্কান শব্দ সিডর বা ‘চোখ’-এর নামে ঝড়ের নামকরণ করা হয়। সিম্পসন স্কেল অনুযায়ী এ ঝড়ের মাত্রা ছিল ‘ক্যাটাগরি-৫’। সরকারি তথ্যমতে, ঝড়ে দুই হাজার ২১৭ জন প্রাণ হারান। পানির চাপে পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদের পাড়ের বেড়িবাঁধ ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ৬৮ হাজার ৩৭৯টি ঘরবাড়ি। পানিতে তলিয়ে বিনষ্ট হয়ে যায় ৩৭ হাজার ৬৪ একর জমির ফসল।

আইলা: ২০০৯ সালে ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাংশে আঘাত হানে। মালদ্বীপের আবহাওয়াবিদরা এর নামকরণ করেন। এর অর্থ হলো ডলফিন বা শুশুকজাতীয় জলচর প্রাণী। ঝড়টির ব্যাস ছিল প্রায় ৩০০ কিলোমিটার, যা ঘূর্ণিঝড় সিডর থেকে ৫০ কিলোমিটার বেশি।

সিডরের মতোই আইলা প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় নিয়ে উপকূল অতিক্রম করে। ঝড়ে ১৯৩ জনের মৃত্যু ও সাত হাজার মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। দুই লাখ গবাদিপশু মারা যায়। উপকূলের ১১ জেলায় প্রায় ছয় লাখ ঘরবাড়ি ও আট হাজার ৮০০ কিলোমিটার রাস্তা বিধ্বস্ত হয়।

ঘূর্ণিঝড় মহাসেন: ২০১৩ সালের মে মাসের শুরুর দিকে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণাংশে নিম্নচাপজনিত কারণে উৎপত্তি ঘটে মহাসেনের। কার্যত স্থির থাকলেও ১০ মে তারিখে ঘণিভূত অবস্থায় চলে যায়। পরবর্তীতে এটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে মৌসুমের প্রথম নামাঙ্কিত ঘূর্ণিঝড় মহাসেনে রূপান্তরিত হয়। ১৪ মে এটি উত্তর-পূর্বাংশের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কার্যত জনজীবন অচল হয়ে পড়ে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*