বার বার রঙ বদলানো রব

আ স ম আবদুর রব একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। বাংলাদেশে যে সমস্ত বিরল ব্যক্তিরা রয়েছেন, যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে আ স ম আবদুর রব একজন।

কিন্তু আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটাও নির্মম বাস্তবতা যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা বিভ্রান্তির রাজনীতি ছড়িয়েছেন; যারা পথভ্রষ্ট হয়েছেন; বার বার রঙ বদল করেছেন- তাঁদের তালিকাতেও আ স ম আবদুর রব অন্যতম। আ স ম আবদুর রব বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন পূজনীয় আর্দশবান এবং শ্রদ্ধার পাত্র হতে পারতেন।

যদি তিনি স্বাধীনতার পর রাজনীতি নাও করতেন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি সম্মানের আসনে থাকতেন। কিন্তু একের পর এক বিভ্রান্তি ভুল সিদ্ধান্ত এবং হঠকারিতার কারণে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন ভাঁড়ে পরিণত হয়েছেন। কখনো গৃহপালিত বিরোধীদল কখনো বা গণতন্ত্রের ছবক দানকারী এ রাজনীতিবিদ এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে হাস্য খোরাকের একটি বড় উৎস হিসেবেই বিবেচিত হন।

আ স ম আবদুর রব মুক্তিযুদ্ধের পর যারা বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করে এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি জাসদ গঠন করার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান একজন ব্যক্তি ছিলেন। এই জাসদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে হঠকারিতা, বিভ্রান্তির একটি ধারা তৈরি করেছিল।

অনেক রাজনৈতিক পন্ডিতই মনে করেন, যদি জাসদ না হতো তাহলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা, এত সহজ হতো না। জাসদের হঠকারিতা, তাঁদের গণবাহিনী এবং তাঁদের বিভিন্ন অপরাধমূলক তৎপরতা বাংলাদেশে একটা অস্থিরতা তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো, বলে অনেকে মনে করেন।

জাসদের মাধ্যমে আ স ম আবদুর রবরা আসলে স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল দেরকে বাংলাদেশে জায়গা করে দিয়েছেন বলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে আ স ম আবদুর রবদের অবস্থান হলো দিকভ্রান্ত নাবিকের মতো। তিনি জানেন না তাঁর ঠিকানা কী?

বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব যখন আস্তাকুড়েঁ নিক্ষিপ্ত হয়, তখন আ স ম আবদুর রব আপোষকামিতা এবং লেজুঁড়বৃত্তির রাজনীতির এক পথ গ্রহণ করেন। সেই পথ দিয়ে তিনি এরশাদের একজন অনুগত রাজনীতিবিদে পরিণত হন। ‘৮৮ এর নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি তাঁর রাজনৈতিক খায়েস কিছুটা পূরণ করতে পারেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ দেশের প্রধান বিরোধীদলগুলো অংশগ্রহণ না করলেও, আ স ম আবদুর রব অংশগ্রহণ করেন।

তিনি বিরোধীদলের নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন। এ সময় তাকে বলা হতো গৃহপালিত বিরোধীদল। এরশাদের পতনের পর তাকে একটু হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু এই হয়রানি উপেক্ষা করে আ স ম আবদুর রবের সুবিধাবাদী রাজনৈতিক ধারা বিকশিত হতে থাকে। তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাধেঁন।

‘৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আ স ম আবদুর রব মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। মন্ত্রী হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে দুনীর্তি-অনিয়মের বহু অভিযোগ উথাপিত হয়েছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলে আবার রঙ বদল করেন আ স ম আবদুর রব। যে আওয়ামী লীগের আমলে তিনি মন্ত্রী হলেন, যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তিনি সরকার গঠন করলেন, সেই আওয়ামী লীগের বিরোধীতা করাই- তাঁর কাজ হয়ে যায়।

মূল বিষয় ছিলো দুনীর্তি এবং অনিয়ম থেকে বাঁচা। আর সেজন্য তিনি বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর তাঁর রাজনীতি যেন পিংপং বলের মতো এদিক থেকে ওদিকে শুধু ছুটাছুটি করেছে। ২০০৮ এর পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে দেন-দরবারে সুবিধা করতে পারেননি।

হালুয়া রুটির ভাগ বাটোয়ারাতে হাসানুল হক ইনুর কাছে পিছিয়ে পড়েন তিনি। আর এ কারণেই হয়ে যান সরকার বিরোধী। সরকার বিরোধী অবস্থান থেকেই তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতায় পরিণত হন। যদিও তাঁর রাজনৈতিক দল ক্ষীণ হতে হতে একটি পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের নেতা হিসেবে তিনি ভবিষ্যতে কিছু একটা করে দেখাবেন এমন হুমকি-ধমকি ভালোই দিতে থাকেন। ২০১৮ ‘র ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে তাঁর ভরাডুবি হয়। এখন তিনি থেকেও নেই। নতুনভাবে আবার কোন রঙে তিনি আর্বিভূত হবেন, সেটার অপেক্ষায় আছেন। আমরা আ স ম আবদুর রবের রঙ বদলের রাজনীতির হয়তো নতুন রঙটা দেখবো খুব শীঘ্রই।সূত্র: বাংলা ইনসাইডার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *