বিদেশিদের যত আজ্ঞাবহ ব্যক্তিত্বরা

একটা সময় ছিল বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল বিদেশ নির্ভর। বিদেশিদের সন্তুষ্ট করতে না পারলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পাকাপোক্ত আসন গড়া যেত না- এরকম একটি প্রবণতা ছিল। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে বলা হতো যে, কমিউনিস্ট পার্টি মস্কোতে বৃষ্টি হলে বাংলাদেশে ছাতা ধরে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন যেভাবে নির্দেশনা দিত সেভাবেই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি কাজ করতো। সাম্যবাদী দল সম্পর্কে বলা হতো যে, সাম্যবাদী দল বাংলাদেশে চীনের অঙ্গসংগঠন এবং চীনের কথায় ওঠাবসা করে। জামাত সম্পর্কে বলা হতো যে, জামাত হলো পাকিস্তানের নির্দেশনায় চলে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত এক যুগে এই বাস্তবতার পরিবর্তন হয়েছে। এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশের কথা বলে হালে পানি পাওয়া দুষ্কর এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাব হস্তক্ষেপ কমে এসেছে। ২০০৮ সালে বিদেশি কূটনীতিকরা সামরিক এবং বেসামরিক সুশীল সমাজের সঙ্গে মিলে একটি সেনা সমর্থিত সরকার ব্যবস্থা চালু করেছিল,

তারপর থেকে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আস্তে আস্তে বিদেশিদের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রিত করেছেন। শেখ হাসিনা সেটাকে আস্তে আস্তে কমিয়ে প্রায় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় নিয়ে গেছেন। কিন্তু রাজনীতিবিদদের উপর নির্ভরতা বা রাজনীতিতে আজ্ঞাবহ ব্যক্তির আকাল হওয়ার পর এখন বিদেশিরা বাংলাদেশের সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমের কিছু ব্যক্তি এবং কিছু বুদ্ধিজীবির উপর ভর করেছেন।

এরাই হলেন এখন বাংলাদেশে বিদেশিদের আজ্ঞাবহ। এই সমস্ত সুশীল বুদ্ধিজীবিরা যত না বাংলাদেশের জনগণের উপর নির্ভরশীল, তাঁর থেকে বেশি বিদেশিদের খুশী করার জন্যে এবং বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশের অবস্থা তুলে ধরার ক্ষেত্রে আগ্রহী এবং বিদেশিদের কথায় সবকিছু করার ব্যাপারে তাঁদের জুরি মেলা ভার।

এই সমস্ত বিদেশি আজ্ঞাবহ ব্যক্তিদের প্রভাব বাংলাদেশে এখন অনেক কমে গেছে। কিন্তু তারপরেও তারা ক্রিয়াশীল এবং তারাই সবসময় তক্কে তক্কে থাকেন যে কখন একটা ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করা যায় যখন বিদেশিদের আধিপত্য এবং প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার প্রতিষ্ঠা করা যায়। এরকম কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে রয়েছেন-

ড. কামাল হোসেন: ড. কামাল হোসেনকে সবসময় মনে করা হয় যে বিদেশিদের ‘ব্লু আইড বয়’। ড. কামাল হোসেন সবসময় বংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে যা করেন তা সব ভিন দেশের নির্দেশে, ইচ্ছায়, আগ্রহে। ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনে যেমন তিনি ছিলেন গণতন্ত্রবিরোধী, এটাও তাঁর বিদেশি প্রভুদের নির্দেশনায়।

আবার ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন বা রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়াটাও বিদেশি প্রভুদের নির্দেশনায়। একটি কৌতুক সবসময় প্রচলিত আছে যে, মার্কিন দূতাবাসের বাংলাদেশি যে রাষ্ট্রদূত হয় তিনি আসলে হন উপরাষ্ট্রদূত, মূল রাষ্ট্রদূত ড. কামাল হোসেন। এর সত্য-মিথ্যা ড. কামাল হোসেনই ভালো বলতে পারবেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: শুধু বাংলাদেশের নাগরিক এটুকুই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পরিচয়, বাকি সমস্ত দায়বদ্ধতা তার মার্কিন মুল্লূকে। তিনি বাংলাদেশের চেয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আনুগত্যেই বেশি আস্থাশীল। বাংলাদেশের যে কোন ছোটখাটো বিরোধেই তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নালিশ জানান। তাকে গ্রামীন ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে যখন বয়সের কারণে বাদ দেওয়া হলো, তখন তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নালিশ করেছিলেন।

এই নালিশ জানাতে গিয়ে তিনি বিশ্বব্যাংকের কাছেও অভিযোগ করেন যেন পদ্মা সেতুতে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বাংলাদেশে কোন দায়বদ্ধতা নেই। বাংলাদেশের জনগণ, রাষ্ট্র বা সরকারের কাছেও তিনি দায়বদ্ধ নন। তিনি আজ্ঞাবহ তার বিদেশি প্রভূদের কাছে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার: ড. বদিউল আলম মজুমদারও এমন একজন ব্যক্তি যিনি বিদেশি রাষ্ট্র এবং কূটনীতিকদের সঙ্গে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বিদেশিদের সন্তুষ্ট, তথ্য সংগ্রহ করা এবং বিদেশিদের আস্থাভাজন হওয়াই হলো তার প্রধান লক্ষ্য। আর এ কারণেই তাকে সবসময় দেখা যায় বাংলাদেশের অগ্রগতি, অগ্রযাত্রার বিপরীতে নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে আগ্রহী হন।

ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন: ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনকে এক সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লোক বলা হতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে, কিন্তু তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাননি। বরং এখনো তিনি মার্কিন অনুগত একজন সুশীল হিসাবেই নিজেকে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। তিনি মার্কিন লবির পক্ষে এটি বলতেও মঈনুল হোসেন গর্ববোধ করেন।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন সোভিয়েত ইউনিয়নে। কিন্তু তিনিও তার অর্থনৈতিক নীতি কৌশল ইত্যাদির ক্ষেত্রে মাথায় রাখেন বিদেশিরা কিসে খুশী হবে। বিদেশিদের বিশ্বস্ত এবং অনুগত হিসাবে বাংলাদেশে যারা পরিচিত তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন এরা।

এক সময় রাজনীতিবিদদের ভাড়া করে বিদেশিরা তাদের স্বার্থ হাসিল করতে চাইতেন, দেশে তারা ব্যবসা বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন। সেইদিন আর নেই, এখন বিদেশি কিছু রাষ্ট্র আমাদের বুদ্ধিজীবি ‘বিশিষ্ট’ ব্যক্তিদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং তাদের মাধ্যমেই এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়ণ করতে চায়। কিন্তু এই গণবিচ্ছিন্ন সুশীলরা বিদেশিদের এজেন্ডা বাস্তবায়ণের ক্ষেত্রে ক্রমশ অকার্যকর হচ্ছেন এবং ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। সূত্র: বাংলা ইনসাইডার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *