মাদ্রাসা শিক্ষক থেকে যেভাবে হেফাজত নেতা আল্লামা শফি

আহমদ শফী ১৯১৬ সালে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানার পাখিয়ারটিলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। হাটহাজারীর আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম ও ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসায় শিক্ষালাভ করেছেন তিনি। এরপর ১২৪ বছরের প্রাচীন আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলামে শিক্ষকতার মাধ্যমে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন।

১৯৮৯ সাল থেকে তিনি ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এবং মুহতারিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এর আগে ২০ বছরেরও বেশি সময় তিনি সেখানে শিক্ষকতা করেছেন। মাদ্রাসাটির শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। ওই মাদ্রাসার প্রধান থাকার সুবাদেই তিনি হেফাজতের নেতৃত্ব পান এবং ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের ৫ মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচীর মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

ইসলাম ও নারী বিষয়ে তাঁর বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়। ব্লগারদের নাস্তিক আখ্যা দিয়ে নানা বক্তব্য এবং পহেলা বৈশাখসহ বাঙালি সংস্কৃতির নানা দিক ও প্রগতির বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে তিনি সমালোচিত হয়েছেন বার বার। যু’দ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ২০১৩ সালে গণজাগরণ আন্দোলন শুরুর পর তার বিরোধিতায় হেফাজতে ইসলামকে নিয়ে মাঠে নেমে আহমদ শফী সারা দেশে পরিচিতি পান।

ওই বছরের ৫ মে সরকার পতনের লক্ষ্যে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচী পালন হয়। এরপর থেকে গোয়েন্দা সংস্থা ও রাজনৈতিক নেতাদের তৎপরতায় সরকারের সঙ্গে হেফাজতের দূরত্ব কমতে থাকে। গত জাতীয় নির্বাচনের সময় বর্তমান সরকারের সঙ্গে সখ্য গড়ার মাধ্যমে তিনি কওমি মাদ্রাসা সনদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিসহ বিভিন্ন দাবি আদায় করেন।

হেফাজতের দাবি অনুযায়ী পাঠ্যবই থেকে প্রগতিশীল কিছু লেখকের কবিতা ও গল্প বাদ দেওয়া হয় এবং সরকারের বিরুদ্ধে এ নিয়ে কড়া সমালোচনা রয়েছে। দেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের তিনিই প্রধান নেতা ছিলেন। আহমদ শফী কওমি মাদ্রাসা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশেরও (বেফাক) সভাপতি পদে ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকসের ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশের ১৩ হাজার ৯০২টি মাদ্রাসায় বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। কওমি মাদ্রাসার পক্ষ থেকে বলা হয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৭ লাখের কম নয়।

মাদ্রাসার নেতৃত্ব: হাটহাজারি মাদ্রাসায় বিক্ষোভ এবং নেতৃত্বের পরিবর্তনকে রাজনৈতিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মাদ্রাসাটির নেতৃত্বে যে পরিবর্তনের আন্দোলন হচ্ছে তাতে সেখানে সরকারপক্ষের অবস্থান দুর্বল এবং বিরোধী পক্ষ সবল হওয়ার সম্ভাবনা দেখেছেন তাঁরা।

অবশেষে আহমেদ শফীর মৃ’ত্যুর ফলে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্ব সরকার বিরোধীদের কবজায় যেতে পারে বলে তাঁরা মনে করেন। একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ইসলামি চিন্তাবিদ জানান, মাদ্রাসায় অস’ন্তোষ শুরু হয়েছিল তাদের অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয় নিয়ে। কিন্তু পরবর্তীতে তার সঙ্গে রাজনীতি যুক্ত হয়েছে।

তার মতে, অসন্তোষ আল্লামা শফীকে নিয়ে নয়, এটা গড়ে উঠেছে তার ছেলে আনাস মাদানীকে নিয়ে। আনাস মাদানীর সঙ্গে হেফাজতের মহাসচিব বাবুনগরীর দ্বন্দ্ব চলছিল, এই পরস্থিতি তারই ফলশ্রুতি। হাটহাজারী মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ ভিন্ন দিকে গেলে হেফাজতের নেতৃত্বে নতুন ধারা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন ইসলামি এই চিন্তাবিদ। এর ফলে হেফাজতের পরবর্তী নেতৃত্ব সরকারের প্রতি মিত্র ভাবাপন্ন নাও হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।

তিনি আরও জানান, মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী হেফাজতের প্রধান নেতা হয়ে গেলে এবং সেখানে আল্লামা শফীর পরিবারের কর্তৃত্ব শেষ হয়ে গেলে কওমি ধারার ইসলামিক আ’ন্দোলনের দিক পরিবর্তন অসম্ভব নয়। জুনায়েদ বাবু নগরী মৌলিক ভাবে বিশেষ কোনও রাজনৈতিক দর্শনের মানুষ নন।

কিন্তু তাদের নেতৃত্বের সামগ্রিক পরিমন্ডল কোন দিকে ঝুঁকবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। নিজেকে একজন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী জানিয়ে তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্ররা সাধারণত জামায়তে ইসলামীর অনুসারী হয় না। তবে নেতৃত্বের বিরোধ চলাকালে একটা অংশ জামায়াত-বিএনপির দিকে ঝুঁকতেও পারে।

জাতীয় রাজনীতি: ওই মাদ্রাসায় নেতৃত্বের পরিবর্তন জাতীয় রাজনীতির ওপর প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তাদের মতে, হাটহাজারী মাদ্রাসায় পরিকল্পিত ভাবেই অস্থিতিশীলতা তৈরি করা হয়েছে এবং তাতে সরকার বিরোধী বিএনপি-জামায়তের হাত থাকতে পারে।

একটি লুকায়িত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই ওই মাদ্রাসার নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার জন্য আ’ন্দোলন করা হচ্ছে, বলেও মনে করেন কেউ কেউ। অনেকেই মনে করেন, সরকারের পতন ঘটানোর জন্যই ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামকে মাঠে নামানো হয়েছিল। সেই আ’ন্দোলনে বিএনপি-জামায়াত সমর্থন দিয়েছিল।

হাটহাজারী হলো হেফাজতের কেন্দ্রস্থল। যারা বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করতে চান তাঁরা আহমেদ শফীসহ ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় যারা আছেন তাদের সহযোগিতা করছেন না। এ জন্যই সেখানে ছাত্রদের উস্কে দিয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা হয়েছে।

আল্লামা আহমদ শফীর মৃ’ত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ শনিবার হাটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে ম’রদে’হ মাদ্রাসার ভেতরে অবস্থিত মসজিদের পাশে দা’ফন করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *