মিয়ানমারের ব্যাপারে যে কারণে নমনীয় বাংলাদেশ!

বাংলাদেশে রোহি’ঙ্গা শরণার্থী সং’কটের ৩ বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে বাংলাদেশ না পেরেছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত নিতে, না পেরেছে রোহিঙ্গা শরণার্থীর ব্যাপারে মিয়ানমারের উপর বড় ধরণের চাপ সৃষ্টি করতে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাকি সবগুলো দেশ প্রকাশ্যে বা গোপনে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করেছে।

বাংলাদেশে যে ১০ লক্ষের বেশি রো’হিঙ্গা অবস্থান করছে এই বিষয়টা তারা আমলেও নেয়নি, পাত্তাও দেয়নি। এ রকম পরিস্থিতিতে রো’হিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে যেন স্থায়ী নিবাস গড়েছে। অন্যদিকে সর্বশেষ প্রকাশিত মানচিত্রে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামটিকে তাদের মানচিত্র থেকেই তুলে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কথাবার্তা এমনকি আন্তর্জাতিক আদালতের রায় ইত্যাদিকে পাত্তা দিচ্ছে না মিয়ানমার।

মিয়ানমারকে যে একঘরে করা হবে এই রকম কোন দৃ’ষ্টান্ত বা নজিরও দেখা যাচ্ছে না। এসব কিছুর মধ্যে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তা হলো- বাংলাদেশ কেন রো’হিঙ্গাদের ব্যাপারে নমনীয়। বাংলাদেশের কূটনীতির একটি লক্ষ্য হল যে, ‘সকলের সাথে মি’ত্রতা কারো সাথে শ’ত্রুতা নয়’। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যখন বাংলাদেশে আসতে শুরু করে, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে, কূটনৈতিকভাবে এই সংক’টের সামাধান করা হবে, যু’দ্ধের মাধ্যমে নয়।

সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, রো’হিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে যু’দ্ধের মতো কোন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এটি বাস্তবতা বিব’র্জিত। কারণ এভাবে যু’দ্ধ হলে বাংলাদেশের ক্ষ’তি বেশি হবে এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হবে। তাই রো’হিঙ্গাদের উ’স্কানির ফাঁদে বাংলাদেশ পা না দিয়ে কূটনীতিক তৎপরতা চালিয়েছে।

কিন্তু কূটনীতিবিদরা মনে করেন যে, রো’হিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের যে ধরণের কূটনৈতিক তৎপরতা করা উচিত ছিল, সেটি বাংলাদেশ করতে পারেনি। বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতার কথা বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়। যদিও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, রো’হিঙ্গাদের ব্যাপারে বাংলাদেশের কূটনীতি সফল হয়েছে। কারণ সারা বিশ্ব রোহি’ঙ্গাদের উপর নি’র্যাত’নের ঘটনাটিকে অ’মানবি’ক বলেছে, অযৌক্তিক বলেছে।

সারা বিশ্বের সব দেশই এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু রোহি’ঙ্গাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অবরোধ কিংবা জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা কোনকিছুই আরোপ হয়নি এখন পর্যন্ত। এটির জন্য বাংলাদেশের যে রকম উদ্যোগী হওয়া উচিত ছিল, সে রকম উদ্যোগী বাংলাদেশ হয়নি বলেই অনেকে মনে করেন। বরং এই ব্যাপারে বিশ্ব উদ্যোগের দিকে বাংলাদেশ তাকিয়ে থেকেছে সবসময়।

মিয়ানমারের ব্যাপারে স্পষ্টত দুটি শিবিরে বিভক্ত বিশ্ব। একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ। তারা মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এবং অং সান সুচি যে সামরিক জান্তাদের সাথে আঁ’তাত করে গ’নহ’ত্যা চালিয়েছে, একটি জাতিগোষ্ঠীর নিধ’ন চালিয়েছে- এই ব্যাপারে নিন্দা জানিয়েছে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন ধরণের আন্তর্জাতিক ফোরামে কঠোর অবস্থান এবং উদ্যোগ নিয়েছে।

কিন্তু রাশিয়া, ভারত এবং চীনের কারণে সেই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত এবং চীনের অত্যন্ত সুসম্পর্ক রয়েছে। দুটি দেশই বাংলাদেশের সাথে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুরক্ষা করে চলেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারত এবং চীনকে বড় ধরণের চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি।

যেমন- সাম্প্রতিক সময়ে ভারত এবং চীনের যে ঝ’গড়া সেই ঝগড়া মেটানোর জন্য রাশিয়া উদ্যোগ নিয়েছে। রাশিয়ার মধ্যস্ততায় দু’পক্ষের বৈঠক হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ রকম কোন তৃতীয় পক্ষ মধ্যস্ততা করেনি। এটি বাংলাদেশের ব্যর্থতা কিনা- এ প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে এটি বাংলাদেশের ব্যর্থতা নয়।

বাংলাদেশ যা কিছু করছে, কূটনৈতিক নিয়ম নীতি এবং শিষ্টাচারের মধ্যে করছে। তবে মিয়ানমারের প্রতি বাংলাদেশের নমনীয়তার একটি কারণ হিসেবে মনে করা হয় ঐতিহাসিক বাস্তবতা। বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে মুক্তিযু’দ্ধের সময় প্রায় একই রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল।

সে সময় বাংলাদেশ থেকে লাখো মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো শরণার্থী হিসেবে। কাজেই শরণার্থীর অধিকার এবং শরণার্থীর আবেগ বাংলাদেশের চেয়ে ভালো কেউ বোঝে না। আর এ কারণেই বাংলাদেশ রো’হিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে মানবিক কারণে।

বাংলাদেশ মনে করে, রো’হিঙ্গাদের আশ্রয় দানের মাধ্যমেই মিয়ানমারের কূটনৈতিক পরাজয় ঘটেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ বলুক না বলুক, বিশ্বে মিয়ানমার একটি অমানবিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এটিই বাংলাদেশের বিজয় বলে মনে করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নীতিনির্ধারকরা।সূত্র: বাংলা ইনসাইডার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *