মেধাবী ইঞ্জিনিয়ার থেকে সাদিয়ার সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠার গল্প

দোকানে গিয়ে কেনাকাটার সময় বের করা ব্যস্তময় জীবনে বেশ কষ্টকর। তার মধ্যে করোনাকালীন এই সময়ে স্বশরীরে দোকানে দিয়ে পছন্দের জিনিস কেনার মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। তাই গেল কয়েক বছরে মানুষ অনলাইন কেনাকাটায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে আগের চেয়ে বেশি। এখন মুঠোফোনে দু-একটি নির্দেশনা দিলেই ঘরে চল আসছে কাঙ্ক্ষিত পণ্য, তাই দীর্ঘ জ্যাম ঠেলে কষ্ট করে দোকানে যাওয়ায় মানুষ দিন দিন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

তবে কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ীদের ফলে অনলাইন বাজারেও দেখা যায় বিশৃঙ্খলা। অনলাইনে কাপড় কিনে অনেককেই পোহাতে নানা ঝঞ্ঝাট। তবে গ্রাহকদের সুবিধার কথা চিন্তা করে এবং মানসম্মত সেবা দিয়ে অনলাইন বাজারে রাজত্ব করছে বেশ কিছু অনলাইন ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা। তাদেরই একজন সাদিয়া ইসলাম।

ছাত্রজীবনে ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে বর্তমানে নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছে নিজের অনলাইন টেইলারিং সার্ভিস। ২০১০ সালে এমআইএসটি (Military Institute of Science & technology) থেকে কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে বিএসসি পাশ করে হয়েছেন একজন সফল অনলাইন উদ্যোক্তা। দেশের অধিকাংশ মেধাবী তরুণ যখন স্নাতক পাশ করে একটি চাকুরীর পেছনে ছুটে তখন একেবারে বিপরীত চিন্তা করে সাদিয়া।

অফিসের ৯টা থেকে ৫টা ধরাবাঁধা জীবনকে কখনো ভালো লাগাতে পারেননি তিনি। বরং ছোট থেকেই স্বপ্ন বুনেছেন স্বাধীনভাবে নিজে কিছু করার। যার পরিক্রমায় পরিবারের অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনলাইনে শুরু করেন নিজের টেইলারিং সার্ভিস “স্টাইল ক্যানভাস”। স্বামীর সাথে পরামর্শ করে ২০১৫ সালে শুরু হয় সাদিয়ার এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পথযাত্রা।

নিজের পরিকল্পনার শুরুর গল্পটি বিডি২৪লাইভ’কে জানিয়েছেন সাদিয়া নিজেই। তিনি বলেন, ‘অনলাইনে পোশাক পাওয়া গেলেও সেই পোশাকগুলো বানাতে দেওয়ার জন্য আমাদের নারীদের যানযট ঠেলে, সময় নষ্ট করে টেইলর শপে যেতে হয়। আর সময়মত পোশাক ডেলিভারি না দেওয়া ও বিশেষ উৎসবগুলোতে যেমন ঈদ, পূজা ইত্যাদি সময় পছন্দের পোশাকটি নষ্ট করে ফেলা, এটি আমাদের দর্জি দোকানের এক চিরাচরিত রূপ। তাই এইসব সমস্যা থেকে সমাধান দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ২০১৫ সালে আমি আমার স্বামীর সাথে পরামর্শ করে ঢাকায় সর্বপ্রথম “স্টাইল ক্যানভাস” নামে নারীদের জন্য ডোর টু ডোর টেইলারিং সার্ভিস শুধু করি।’

‘অর্থাৎ নারীরা অনলাইনে পোশাক কেনার পাশাপাশি টেইলারিং সার্ভিসটিও যাতে ঘরে বসে তাঁদের সুবিধামত সময় নিতে পারেন মূলত এটিই ছিল আমার সার্ভিসের উদ্দেশ্য। এবং আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল কোয়ালিটি সম্পন্ন একটি টেইলারিং সার্ভিস দেওয়া যাতে সময় মত ডেলিভারি দেওয়া এবং সেলাইয়ের কোয়ালিটির বিষয়গুলো ব্যাহত না হয়।’ যোগ করেন সাদিয়া।

বাবা-মা’র ঘরে দুই বোনের মধ্যে সাদিয়া। বড় বোন পেশায় একজন ডাক্তার। তাই সাদিয়াকে নিয়েও বাবা-মা’র ইচ্ছে ছিল ভিন্ন কিছু। তবে সাদিয়ার পছন্দ ছিল ব্যাক্তি স্বাধীনতা। তাই বাবা-মা’র ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে এমন উদ্যোগকে সফল করা সাদিয়ার জন্য মোটেও সহজ কাজ ছিল না। তিনি বলেন, ‘উদ্যোগটি নিতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছিল কারণ টেইলারিং লাইনে তেমন কোন অভিজ্ঞতা আমার ছিল না এবং ঢাকায় এই সার্ভিসটি তখন সম্পূর্ণই নতুন।

আর অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এইরকম একটি টেইলারিং সার্ভিস শুরু করা অনেকটা চ্যালেঞ্জিং ছিল কারণ এইখানে গ্রাহকের বিশ্বস্ততা অর্জন করার একটি ব্যাপার ছিল। তারপরও ধীরে ধীরে আমার গ্রাহকদের কাছে বিশ্বস্ততা বাড়তে থাকলো এবং অর্ডারের পরিমাণও বাড়তে থাকলে। সেই সাথে বাড়াতে হলো কর্মী এবং মেশিনারিজ। উদ্যোগের চলার পথে অনেক চড়াই উৎরাই এসেছে কিন্তু কখনো হাল ছেড়ে দেই নি। বাবা মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধের পেশায় যদিও গিয়েছি কিন্তু আমার বাবা মা এবং স্বামীর পূর্ণ সাপোর্ট শুরু থেকেই পেয়েছি।’

বিশ্বজুড়ে তাণ্ডব চালানো মহামারি করোনায় স্থবির হয়ে পড়ে পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা। দেশেও দেখা যায় এর ভয়ংকর প্রভাব। দেশের প্রতিটি ব্যবসায়িক স্তরে দেখা দেয় হাহাকার। কিন্তু এই দুঃসময়েও শুধু মানসম্মত পণ্য এবং উন্নত সেবা দেয়ার ফলে সাদিয়ার ব্যবসায় কোনো প্রভাব পড়েনি বলে জানান তিনি।

সাদিয়া বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে যেখানে পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছিল সেখানে আল্লাহর অশেষ রহমতে গত বছরের ঈদ এবং এই বছরেও আমার সার্ভিসটি পুরো দমে চালু ছিল। কারণ মার্কেট প্লেইসের টেইলর শপে গিয়ে অর্ডার দেওয়ার চেয়ে ঘরে বসে অর্ডার দেওয়াটা কিছুটা নিরাপদ। তাছাড়া আমি আমার কর্মীদের স্যানিটাইজেশনের ব্যাপারে সবসময় সতর্ক ছিলাম। এখনো আমি প্রতিটি কর্মীর স্বাস্থ্য সচেতনার বিষয়গুলো খেয়াল রাখি। ভবিষ্যতেও আমি রাখার চেষ্টা করবো।’

নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ব্যাপারে সাদিয়া জানান, ‘আমার ইচ্ছে, আমার উদ্যোগের গন্ডিকে শুধু টেইলারিং সার্ভিসটির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো টেইলারিং সেক্টরটিকে কিভাবে অনলাইন বেইসড করা যায় তা নিয়ে কাজ করা। সেজন্য আমি গতবছর লকডাউনে নারীদের জন্য অনলাইন টেইলারিং কোর্স চালু করেছি। যাতে ঘরে বসে নারীরা কাজ শিখে কিছুটা অর্থ উপার্জন করতে পারেন।’

সম্প্রতি নিজের অনলাইন টেইলারিং কোর্সের পরিধি বৃদ্ধি করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি গ্রুপ খুলেছেন সাদিয়া। ‘Sewing Crafters’ নামের এই গ্রুপে যারা টেইলারিং এবং হাতের কাজ জানেন তাদের সবাইকে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন তিনি।

সাদিয়া বলেন, ‘গ্রুপটিতে যারা কাজ জানেন তারা তাদের কাজের ভিডিও টিউটরিয়াল শেয়ার করে থাকেন, যা দেখে নতুন যারা আছেন তারা কাজ শিখতে পারেন। তাছাড়া আমার পরিকল্পনা, তাদের মাধ্যমে প্রোডাক্ট তৈরি করে আমার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেগুলো বিক্রি করা। এতে তারাও আর্থিকভাবে কিছুটা লাভবান হবে, আমিও কিছুটা লাভবান হবো।’

শূন্য থেকে আজ অনলাইন বাজারে একটি ভালো অবস্থানে দাঁড়িয়েছে সাদিয়ার তৈরি “স্টাইল ক্যানভাস”। চলতি মাসের ৩ তারিখে পূর্ণ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির অর্ধযুগ। ক্ষুদে উদ্যোক্তা থেকে দেশের একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠা সাদিয়া জানান, ‘এ বছর মে মাসের ৩ তারিখ আমার প্রতিষ্ঠানটির অর্ধযুগ পূরণ হয়েছে। অর্থাৎ সাত বছরে পদার্পণ করেছে ‘স্টাইল ক্যানভাস’।

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.