যে পাঁচ তারকা ক্রিকেটাররা কখনোই আইপিএলে খেলার সুযোগ পাননি

২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১২১ কোটির মতো। বলা বাহুল্য, বিশাল এই জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বরাবরই ভালোরকমের সমর্থন পেয়ে আসছে দেশটির ক্রিকেট বোর্ড। তাই তো ক্রিকেটারদের মানোন্নয়নের জন্য প্রতিনিয়ত কাড়ি কাড়ি টাকা ঢালতে কোনোরকম কষ্ট করতে হয় না বিসিসিআইয়ের।

ঘরোয়া-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন টুর্নামেন্ট থেকে আয় করা অর্থ দিয়ে বেশ সাচ্ছন্দ্যেই সারাবছর বিভিন্ন ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করে চলেছে তারা। তবে এসবের মধ্যে সবচেয়ে নজর কাড়া আসরটি বসে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএলের সময়। ২০০৮ সাল থেকে শুরু হওয়া জাঁকজমকপূর্ণ এই টুর্নামেন্টটি ইতোমধ্যে তার বারোটি আসর পিছনে ফেলে এসেছে।

দীর্ঘ এই সময়ে আইপিএল নিজেকে নিয়ে গেছে বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল টুর্নামেন্টগুলোর তালিকায়। এরইমধ্যে বিশ্বের বহু নামকরা ক্রিকেটাররা এখানে এসে নিয়মিতভাবে খেলে গেছেন এবং প্রতিবছরই সেই তালিকাটি আরো দীর্ঘ হচ্ছে।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে এমন কিছু তারকা ক্রিকেটাররাও আছেন যাঁরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহুবার নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন এবং বরাবরই আইপিএলের মতো সম্মানজনক টুর্নামেন্টে খেলার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে কখনোই তাঁরা আইপিএলে দল খুঁজে পাননি কিংবা ইনজুরির জন্য আর কখনো খেলে ওঠা হয়নি। সেরকম পাঁচ সুপারস্টারকে নিয়েই আজ দু-চার কলম লিখছি।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ বাংলাদেশের জাতীয় দলের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ নিঃসন্দেহে বিশ্বের সেরা ফিনিশারদের একজন। কঠিন সময়েও ঠান্ডা মেজাজে দুর্দান্ত শট খেলার সক্ষমতা তাঁকে বড় বড় ক্রিকেট বিশ্লেষকদের কাছেও আঁধার ঘরের মানিকে পরিণত করেছে।

ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি নিজস্ব ধাঁচের অফস্পিন বোলিংয়ের জন্যও তাঁর বেশ সুপরিচিতি রয়েছে। জাতীয় দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বেশ কয়েকবার মূল্যবান কিছু উইকেট শিকার করে বল হাতেও জয়ের পিছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন তিনি। বর্তমানে আইসিসির টি-টোয়েন্টি অলরাউন্ডিং র‌্যাংকিংয়ে মাহমুদউল্লাহ দশ নম্বর স্থানে থাকলেও, দীর্ঘ সময় ধরে ছিলেন শীর্ষ পাঁচে।

সুতরাং সবমিলিয়ে মাহমুদউল্লাহ আইপিএলের দুয়েকটি মৌসুমে খেলার দাবি তো রাখেনই। সেলক্ষ্যে টুর্নামেন্টটির এবারের প্লেয়ার ড্রাফটে নিজের নামটি অন্তর্ভুক্তও করেছিলেন। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোনো দলই তাঁর প্রতি আগ্রহ দেখায়নি। আর এজন্য তাঁর মনে কোনো হতাশাও নেই। যদিও ভবিষ্যতে কখনো সেখানে খেলার ব্যাপারে তিনি দারুণ আশাবাদী।

সম্প্রতি ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবালের এক লাইভ অনুষ্ঠানে এব্যাপারে তিনি বলেছিলেন, ‘আইপিএলের মতো টুর্নামেন্টে তো সবাই খেলতে চায়। এই টুর্নামেন্টই এরকম। দারুণ চাকচিক্যময়। বিশ্বের সেরা টি-টোয়েন্টি লিগ। খেলতে পারলে অবশ্যই ভালো লাগত। সবাই চায় সেরা টুর্নামেন্টে নিজেকে দেখতে। এর কারণে মন খারাপ করে বসে থেকে তো লাভ নেই। আশা করি, ভবিষ্যতে কখনো সুযোগ আসবে।’

অন্যদিকে নিজেদের দেশের ঘরোয়া টুর্নামেন্টে মাহমুদউল্লাহর দেখা পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোও। তাদের মতে, রয়্যাল চ্যালেঞ্জার ব্যাঙ্গালোর এবং সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের মতো দলগুলো ইদানিং ভালো কোনো অলরাউন্ডারের অভাবে ভুগছে। সেখানে মাহমুদউল্লাহ তাদের জন্য হতে পারেন একটি নিখুঁত সমাধান।

ব্রায়ান লারা ক্রিকেট ব্রায়ান লারার মতো দুর্দান্ত ব্যাটসম্যানের দেখা খুব কমই পেয়েছে। সাবেক ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক লারা বরাবরই ছিলেন তাঁর প্রজন্মের সেরা আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান। অবশ্য তিনি যখন তাঁর বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে বিদায় জানাচ্ছিলেন, তখন আইপিএল আয়োজনের কথাবার্তা সবেমাত্র শুরু হয়েছে।

তাই ঘূর্ণাক্ষরেও কেউ ভাবতে পারেনি যে ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি হয়তো কখনো আইপিএলে খেলার আগ্রহ প্রকাশ করবেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেটাই ঘটলো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর চার বছর পর হঠাৎ করেই, আইপিএলের চতুর্থ আসরের প্লেয়ার ড্রাফটে নিজের নামটি যোগ করেছিলেন তিনি।

কিন্তু ৪২ বছর বয়সী লারা ততদিনে ক্রিকেট থেকে অনেকটা দূরে চলে গিয়েছিলেন এবং সেজন্যই কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি ঝুঁকি নিয়ে তাঁকে কিনতে রাজি হচ্ছিলেন না। অবশ্য এরপর থেকে লারা নিজেও আর কখনো টুর্নামেন্টটিতে খেলার ইচ্ছাপ্রকাশ করেননি এবং তাই তাঁর সেই স্বপ্নটা চিরদিনের জন্য অধরাই রয়ে গেছে।

মুশফিকুর রহিম বর্তমান বিশ্বের অন্যতম স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম বহুদিন ধরেই বাংলাদেশের জাতীয় দলের জন্য আশা-ভরসার প্রতীক হয়ে রয়েছেন। এছাড়া গেম ফিনিশিংয়ের দারুণ সক্ষমতা এবং উইকেটের পিছনের দায়িত্ব সামলানোর যোগ্যতা তাঁকে সবার চেয়ে আলাদা করেছে।

পাশাপাশি দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পঞ্চম সেরা অধিনায়কের তকমাটাও রয়েছে তাঁর নামের পাশে। অতএব আইপিএলে খেলার মতো প্রয়োজনীয় সব যোগ্যতাই রয়েছে মুশফিকের মাঝে। এমনকি ইতোমধ্যে অনেকবার তাঁর নাম আইপিএলের প্লেয়ার ড্রাফটে দেখা গিয়েছিল। তবে কোনো এক অজানা কারণে একবারও কোনো দল তাঁর প্রতি আগ্রহ দেখায়নি।

তবে আইপিএলে দল না পেয়ে মাহমুদউল্লাহর মতো মুশফিকও কোনোভাবে নিরাশ হননি। তাঁর বক্তব্য, ‘সত্যি বলতে আমি প্রথমে নিবন্ধন করতে চাইনি। আমি জানতাম, হয়তো আমাকে নিবে না। এজন্য শুধু শুধু নাম দিয়ে লাভ কি!

এরপর তারাই যখন অনুরোধ করল তখন ভাবলাম, অনুরোধ যখন করেছে তাহলে দলে নেয়ার সুযোগ থাকতে পারে।তিনি আরো বলেন, ‘আইপিএলে দল পাওয়া না পাওয়ায় আমার হাতে নেই। আমাদের কাজ হলো ধারাবাহিক পারফর্ম করা। আইপিএলে দল পেলাম কি পেলাম না এব্যাপারে আমার মাথা ঘামানোর কিছু নেই।

অবশ্য মুশফিকের ব্যাপারে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো বলছে, আইপিএলে প্রতিটি দল তাদের মূল একাদশে মাত্র চারজন বিদেশি খেলোয়াড় রাখতে পারে। এছাড়া স্কোয়াড গঠনেও বিদেশিদের কোটা খুব সীমিত থাকে। একারণেই মূলত বিশ্বের অনেক তারকা ক্রিকেটাররা কোনো দল খুঁজে পান না। তবে এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কিছুটা সদয় হলে, বিদেশি খেলোয়াড় এবং ফ্র্যাঞ্চাইজির উভয়েই লাভবান হতে পারে।

স্টুয়ার্ট ব্রড স্টুয়ার্ট ব্রড – নামটি শুনলেই উপমহাদেশের ক্রিকেট দর্শকদের মনে একজন তরুণ ইংলিশ বোলারের মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে, ২০০৭ বিশ্বকাপে যার স্পেলের শেষ ওভারের প্রতিটি বলকেই ভারতীয় অলরাউন্ডার যুবরাজ সিং মাঠ ছাড়া করেছেন। কিন্তু বাস্তবে তখনকার ব্রড আর আজকের ব্রডের পার্থক্যটা রীতিমতো আকাশ-পাতাল।

৩৪ বছর বয়সী স্টুয়ার্ট গত এক যুগে ছোট ফর্ম্যাটের ক্রিকেটে তাঁর দেশের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকার করেছেন। যেখানে গোটা ক্যারিয়ারে তাঁর বোলিং এভারেজও ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয় (প্রায় ২৩)। এছাড়া টি-টোয়েন্টিতে জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।

একইসঙ্গে টেস্ট ফর্ম্যাটেও ইংল্যান্ডের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকার করেছেন এই স্টুয়ার্ট ব্রডই। তাই দিনশেষে টেস্টের মাধ্যমেই বেশি সুনাম কুঁড়ালেও সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও বেশ দারুণ প্রদশর্নীই দেখিয়েছেন এই গতি তারকা।

এরই সুবাদে ২০১১ সালে প্রায় চার লাখ ডলারে তাঁকে নিলাম থেকে কিনে নিয়েছিল কিংগস ইলেভেন পাঞ্জাব। অবশ্য আটকপালে ব্রড তারপরও কখনো আইপিএলে খেলতে পারেনি। কেননা ইনজুরি সেবার তাঁর এই স্বপ্নযাত্রার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যা হোক, পরের আসরে আবারো আশায় বুক বেঁধে ব্রডকে নিজেদের দলেই রেখে দিয়েছিল বলিউড অভিনেত্রী প্রীতি জিনতার দলটি।

কিন্তু এবারো খেলা শুরু হওয়ার ঠিক আগে কাকতালীয়ভাবে পুনরায় ইনজুরিতে পড়ে লাল জার্সি গায়ে একটি ম্যাচেও খেলতে পারেননি তিনি। ফলে শেষপর্যন্ত পাঞ্জাবের ফ্র্যাঞ্চাইজিটি তাঁকে ছেড়ে দেয় এবং সেই থেকে আর কখনোই কোনো দল ইংলিশ তারকাকে নিজেদের করে নেয়নি।

কেভিন ও’ব্রায়েন ২০১১ বিশ্বকাপের আয়ারল্যান্ড-ইংল্যান্ডের ম্যাচের কথা কে-ই বা ভুলতে পারে! তরুণ আয়ারল্যান্ড সেবার সবেমাত্র নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপটি খেলছিল। যেখানে প্রতিবেশী দেশ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লড়াই করাটাই ছিল তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তাই খেলা মাঠে গড়ানোর আগেই সবাই ধরে রেখেছিলেন যে, খুব বড় ব্যবধানেই আইরিশদের বিরুদ্ধে জয় তুলে নিতে সক্ষম হবেন ইংলিশরা। আর সেদিন ব্যাঙ্গালোরে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করে ধীরে ধীরে সে পথেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন কেভিন পিটারসেন-জোনাথন ট্রটরা। নির্ধারিত ওভার শেষে তারা স্কোরবোর্ডে তুলেছিলেন ৩২৭ রানের বিশাল সংগ্রহ।

তবে বিরাট লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে যে আইরিশরা ভয় পেয়েছিলেন, তা কিন্তু নয়। বিশেষ করে সেই বিকালে পুরো দলের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মিডল অর্ডারে ব্যাটিং করতে নামা হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান কেভিন ও’ব্রায়েন। তাঁর ৬৩ বলের ১১৩ রানের অনবদ্য এক ইনিংসই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আয়ারল্যান্ডকে ২ উইকেটের ব্যবধানে জয় পাইয়ে দেয়।

তার পরেরদিন থেকেই বড় বড় পত্রিকা – সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে এসে পড়েন কেভিন। বিশ্বের বিভিন্ন টুর্নামেন্টে তাঁর ডাক পড়তে থাকে। আর আজ ২০২০ সালে এসে তিনি আইরিশ দলের অন্যতম সেরা ‘পোস্টার বয়ে’ পরিণত হয়েছেন।

কিন্তু হতাশাজনকভাবে তিনিও কখনো আইপিএলে খেলার সুযোগ পাননি। যদিও ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকবার প্লেয়ার ড্রাফটে নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন তিনি। আর এরপরে আর কখনোই সেখানে নিজের নামটি অন্তর্ভুক্ত করেননি কেভিন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*