শেখ হাসিনা কী তাহলে ভারত বিরোধী!

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত সব সময়ই একটা বড় ফ্যাক্টর। ভারত বিরোধিতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় উপাদান হিসেবে দীর্ঘ সময় বিরাজমান ছিলো। ভারত বিরোধিতা করে মানুষের ভোট পাওয়ার এক অদ্ভুত প্রবনতা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। এর প্রধান কারন হলো দুটি; একটি হলো বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক এক ঐতিহাসিক রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ছিলো মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বকারী দল। আর বাংলাদেশের মুক্তিযু’দ্ধে সবচেয়ে বেশি সহযোগীতা করা দেশটির নাম অবশ্যই ভারত। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দুটি রাষ্ট্রের যে সম্পর্ক; সে সর্ম্পকটি একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ধারন করে আছে।

অন্যদিকে ছোট একটি দেশের বড় প্রতিবেশি হলো ভারত। যেখানেই ছোট প্রতিবেশির প্রতি পাশে বড় রাষ্ট্র থাকে সেখানেই আগ্রাসন, অনাস্থা এবং উৎকন্ঠা সব সময় কাজ করে। বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সেটি হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এটি বুঝেছিলেন। এ কারণেই তিনি মুক্তিযু’দ্ধের পর পরই ভারতীয় সৈন্যদের বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার করার জন্য বলেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর এই আহবানকে সাড়া দিয়ে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রত্যাহার করে নেন। একটি যু’দ্ধ শেষে মিত্র বাহিনীর সৈন্য এতো দ্রুত প্রত্যাহার পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন এবং বিরল ঘটনা।

বঙ্গবন্ধু একই সাথে দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যতে যাতে সম্পর্কের টানাপোড়েন যাতে না হয় এজন্য একটি মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করে রেখেছিলেন। যে মৈত্রী চুক্তির একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছিলো। মৈত্রী চুক্তির কারনেই বাংলাদেশ ভারত সর্ম্পক এখন একটি ভারস্যামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর শাসন ক্ষমতায় আসে স্বাধীনতা বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলো এবং খন্দকার মোশতাক জিয়াউর রহমান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সবাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল ধারা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী অবস্থান থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে থাকেন। আর এ কারণেই জনগণকে বি’ভ্রান্ত করা এবং জনগণের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য দেশের রাজনীতিতে ভারত বিরোধী শ্লোগান আমদানি করা হয়।

ভারতের বিরোধিতা করাই যেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি জনপ্রিয় উপাদান। আর বাইরে ভারত বিরোধীতা করা হলেও ভেতরে ভেতরে ভারতের সঙ্গে দেন-দরবার করা এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতকে যা যা দিতে হয় তা তা দেয়ার জন্য গোপনে ভারতের কাছে আত্নসমর্পনের নীতি অনুসরণ করেছিল পচাঁত্তর পরবর্তী প্রায় সবগুলো সরকারই।

আর এ কারণেই বাংলাদেশ তাঁর ন্যায দাবী-দাওয়াগুলো যেমন ফারাক্কার পানি চুক্তি, তিনবিঘা করিডোর, ছিটমহল সমস্যা, সমুদ্রসীমার সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যাগুলোর দিকে স্বাধীন ও স্বাতন্ত্র্যভাবে নজর দিতে পারেনি। ভারতের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে নিজেদের দাবী দাওয়ার ব্যাপারে কূটনৈতিক প্রয়াস রাখতে পারেনি পঁচাত্তর পরবর্তী সরকারগুলো। আর এমন বাস্তবতায় বাংলাদশের রাজনীতিতে দুটো ধারা তৈরি হয়।

একটি ভারতের পক্ষের ধারা অন্যটি ভারত বিরোধীধারা। আওয়ামীলীগকে ভারতের পক্ষের রাজনৈতিক দল হিসেবে লেবেল করার এক নোংরা চেষ্টা চলে। ১৯৯১ এর নির্বাচনের সময় বেগম খালেদা জিয়া প্রকাশ্যেই আওয়ামী লীগকে ভারতের দালাল এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশে উলু ধ্বনি হবে, ফেনী পর্যন্ত ভারতের দখলে চলে যাবে ইত্যাদি আজগুবি, অবাস্তব রাজনৈতিক বক্তব্য দেন।

তার মূল বিষয়টি ছিল ভারতের থেকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক অদ্ভুত রাজনৈতিক জিকির জনপ্রিয় করা। ‘৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ ভারতের সঙ্গে নায্য দাবী দাওয়া ও হিস্যাগুলো আদায়ের চেষ্টা করে। গঙ্গার পানি চুক্তি, পার্বত্য শান্তি চুক্তি ছিলো তার মধ্যে অন্যতম।

কিন্তু তারপরেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ রকম প্রচারণা চালানো হয় যে, শেখ হাসিনা ভারতপন্থী। এবং পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে তিনি দীর্ঘদিন ভারতে ছিলেন। এজন্য ভারত এই চুক্তিগুলো স্বাক্ষর করেছে। ২০১৪ এর নির্বাচনের পরে বিএনপি নেতারা প্রকাশ্যেই বলছিলেন যে, শেখ হাসিনা ভারতের আশীবার্দপুষ্ট এবং আওয়ামী লীগ ভারতের আশীবার্দেই ক্ষমতায় টিকে আছে।

যদিও বিএনপি নেতারা ২০০১ এর নির্বাচনে এক রকম মুচলেকা দিয়েই ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল। এখনও ভারতের মন জয় করার জন্য প্রকাশ্যে গোপনে নানা রকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা আসলে ভারতের পক্ষেও না বিরোধীও না।

বরং দেশের স্বার্থকে দেখাই হলো শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। যে বৈশিষ্ট্যটি আসলে সূচনা করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি যেমন ভারতীয় সৈন্যকে ফেরত পাঠাতে সফল হয়েছিলেন তেমনি ভারতের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের সর্ম্পক স্থাপন করতে পেরেছিলেন।

ঠিক তেমনি, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নায্য দাবী-দাওয়াগুলো ভারতের কাছ থেকে যেমন আদায় করেছেন, তেমনি ভারতের সঙ্গে একটি সৎ, সুন্দর, বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পক স্থাপনের ব্যাপারে আন্তরিক ছিলেন। শেখ হাসিনা যে নিজের দেশের স্বার্থকে কখনো জলাঞ্জলি দেননি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের অস্থিরতা।

বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে চীনের অংশীদারিত্ব নিয়ে ভারত যেমন খুশি না; ঠিক তেমনি বাংলাদেশের উন্নয়নেও ভারতের একটি মহল উদ্বিগ এবং আতংকিত। পাশাপাশি শেখ হাসিনা যে বাংলাদেশে কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের লালন করেন না, সে ব্যাপারটির জন্য ভারতীয়রা সব সময় শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞ।

কাজেই দুই দেশের সর্ম্পক সুস্পষ্ট ভারস্যাম্যের ওপর সুরক্ষিত এবং যেখানে শেখ হাসিনা সব সময় নিজের দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেন। এখন যখন ভারত দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিলো, তখন নতুন করে আলোচনা হচ্ছে তাহলে বাংলাদেশ ভারত সর্ম্পকে টানাপোড়েন তৈরী হলো কিংবা ভারত কী বাংলাদেশের ওপর নাখোশ হলো?

এসব প্রশ্ন করা হচ্ছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন করা হচ্ছে না- শেখ হাসিনা কী তাহলে দেশের স্বার্থকে দেখেন? শেখ হাসিনা কী ভারত বিরোধী? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন শেখ হাসিনা ভারত বিরোধীও নন। শেখ হাসিনা ভারতপন্থীও নন। শেখ হাসিনা বাংলাদেশপন্থী এবং দেশের স্বার্থের জন্যই তিনি সব কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

শেখ হাসিনা যে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেন তার বড় প্রমাণ হলো, ভারতের সাম্প্রতিক অস্বস্তি এবং উদ্বেগ, উৎকন্ঠা। শেখ হাসিনার ‘বাংলাদেশ সবার আগে কৌশলই’ হলো স্বাধীন সার্বভৌমত্ব বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান উপজীব্য। সূত্র: বাংলা ইনসাইডার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *