সালমান শাহঃ আমাদের হারিয়ে যাওয়া স্টাইল আইকন

১৯৭১ সাল! সিলেটের জাকিগঞ্জে সেপ্টেম্বরের ১৯ তারিখে কমর উদ্দিন চৌধুরী ও নীলা চৌধুরীর কোলে জন্ম নিলো একটি শিশু। সেদিন জন্ম নেওয়া সেই ছোট্ট শিশুটি শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। আমাদের ‘সালমান শাহ’। সালমানের নানা পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সিনেমা মুখ ও মুখোশের অভিনেতা থাকায় ছোটবেলা থেকেই সালমান বড় হচ্ছিলেন সংস্কৃতিক আবহে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা তার ইচ্ছার কথা থেকেই জানা গিয়েছিলো বড় হয়ে অভিনেতাই হতে চেয়েছিলেন সালমান শাহ। আশির দশকে অভিনয় জীবন শুরু করলেও, সালমানের “সালমান শাহ” হয়ে ওঠার শুরু নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯৩ সালের দিকের কথা, সেই সময়ে আমির খান ও জুহি চাওলা অভিনীত তুমুল জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমা “কেয়ামত সে কেয়ামত তক” এর কপিরাইট কিনে নেয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আনন্দ মেলা।

সোহানুর রহমান সোহান ওই সময়টায় তার সিনেমার জন্য একটি নতুন মুখ খুজছিলেন। অবশেষে সোহানুর রহমান সোহান আবিস্কার করলেন ঢালিউডের সর্বকালের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার সালমান শাহকে। নির্মাণ করলেন সালমানের প্রথম সিনেমা “কেয়ামত থেকে কেয়ামত”। চার বছরের ছোট সিনেমার ক্যারিয়ারে মোট ২৭ টি সিনেমায় অভিনয় করেন সালমান শাহ।

ওই সময়টাতে আজকের মতো ইন্টারনেট দুনিয়া উন্মুক্ত ছিলো না। কিন্তু সালমান শাহ একমাত্র নায়ক যিনি তার প্রতিটি সিনেমায় নিজেকে আলাদা আলাদা রুপে আর ভিন্ন ভিন্ন স্টাইলে দর্শকদের সামনে নিয়ে এসেছেন। আজকের ফলোয়ার শব্দটি আমাদের খুব পরিচিত। আজকের অনলাইন দুনিয়া আর ফেসবুক আসার দেড় যুগ আগে সালমান নিয়ে এসেছিলেন ফলো অপশনটি।

ফলো করার মতো হাজারটা দিক সালমান তার ভক্তদের সামনে নিয়ে এসেছিলেন নব্বইয়ের দশকে। নব্বই দশকের উঠতি তরুণদের চোখ বুজে ফলো করতো সালমানকে। পুরো একটা জেনারেশন চোখ বুজে ফলো করে গেছে সালমান শাহকে। টি শার্ট, সামনের দিকে ইন করে রাখলেও, পিছনের দিকে খানিকটা ঝুলিয়ে রাখা।

কিছুক্ষন পরপর দাঁত দিয়ে নখ কাঁটা, চারকোণা সানগ্লাসের ট্রেন্ড ভেঙ্গে, গোল বা ওভাল সানগ্লাস পরা শুরু করা, মিলাদে বা, রুমাল গিট্টু মেরে মাথায় বাঁধা, স্নিকারস বা ক্যানভাস সু তে (কেডস) ফিতা না বেঁধে হাঁটা, কালো জুতার সাথে সাদা মোজা পড়া,

প্যান্টের বেল্টের ফুঁটা থেকে দ্বিগুণ তিনগুন সাইজে বড় গলার মেডেলের মত বড় বাকেলসেরওয়ালা বেল্ট পড়া, ডান হাতে ঘড়ি পড়া, একটু পর পর চশমায় হাত দেয়া, টিশার্ট এর উপরে বোতাম খোলা শার্ট, বাহারি ডিজাইনের সানগ্লাস পড়া এমন আরো হাজারটা স্টাইল সালমান শিখিয়েছিলেন পুরো একটি জেনারেশনকে।

ওই সময়টাতে এলিফ্যান্ট রোড এ ছিলো বেশকিছু জুতা আর টিশার্ট এর দোকান। সালমানের মৃত্যুর পর রীতিমত ধ্বস নামে জিন্স, টি-শার্ট আর কেডসের বাজারে, কারণ বাংলাদেশ হারিয়েছে তার স্টাইল আইকনকে। যার দেখানো স্টাইলে বুদ হয়ে থাকতো তখনকার প্রজন্ম। সালমানের মৃত্যুর পর থেকে এখনো বলিউডের অনেক নায়ককেই দেখা যায় সালমানকে ফলো করতে।

হ্যা, সালমানের স্টাইল সেন্স এতোটাই বৈচিত্রিময় ছিলো যে আজকের দিনেও তার শেখানো স্টাইল ফলো করা হয়। সালমান সবসময় রেয়ার ব্রান্ড পছন্দ করতেন। প্রচুর ধুমপানের অভ্যাস ছিলো সালমানের, সেই নব্বইয়ের দশকেই তিনি মার্লবোরো সিগারেট খেতেন যা ওই সময়ে বলতে গেলে প্রায় দুষ্প্রাপ্যই ছিলো। সালমান শাহ Bike রাইডিং এবং Cycling এ বেশ দক্ষ ছিলেন।

সিনেমায় তাকে সেই সময়ের cb550, escort115 Bike ব্যবহার করতে দেখা গেছে। ফোর হুইলের বাইকও তার ছিল। মোটর বাইকের পাশাপাশি ক্যাজুয়াল রাইডিং এর জন্য হাতে Gloves পরে চওয়া হুইলের Mountain/Hybrid Bicycle রাইড করতেন যেটা শুধুমাত্র ওজন কমাতেই সাহায্য করেনা হাল আমলে এটা ফ্যাশন অনুষঙ্গও বটে।

ড্রাইভিং খুব ভালো জানতেন সালমান শাহ। ডানা মেলা সেই Mark2 Series এর Chaser গাড়িটি সালমানের অনেক পছন্দের ছিল। তার অনেক ছবিতেই গর্জিয়াস লুকের গাড়িটি নিয়ে Show off করতে দেখা গেছে। প্রায়ই শ্যুটিং শেষে রাতে বাসায় ফিরে না যেয়ে গাড়ি নিয়ে মেঘনা ব্রিজে চলে যেতেন, রাতের বেলা গাড়ি নিয়ে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতেন সালমান।

ফরমাল এবং ক্যাজুয়াল উভয় ধরনের ড্রেসের সাথে সালমান বিভিন্ন ধরনের Bracelet ব্যবহার করতেন যেটা কুল বয় লুকস পেতে ফ্যাশনের অন্যতম অনুষঙ্গ। তিনি Stretch Bracelet, Silver Bracelet ব্যবহার করতেন। গলায় Gold Chain এর পাশাপাশি Horn Pendant, Silver Pendant ক্যাটাগরির Men’s Necklace ব্যবহার করতেন। কানে Men Stud Earring, Hoop Earring পরতেন।

আঙ্গুল আবার বাদ যাবে কেন? Gold Ring এর সাথে Stylish Gemstone Finger Ring পরতেন সালমান। সালমানের বাসায় শেলফ ভর্তি শত শত জোড়া সু, লোফার, কনভার্স, হাই বুট এবং কেডস ছিল। তিনি সিনেমার প্রতিটা দৃশ্য জুতা পরিবর্তন করতেন। অল্প দিনের ক্যারিয়ারে সালমান সিনেমায় মোট 300 জোড়া জুতা ব্যবহার করেছেন যা রীতিমত রেকর্ড হয়ে আছে।

সালমান ক্যারিয়ারের শুরুতে কিছুটা লম্বা চুল রেখেছেন। মাঝে দিয়ে Short Hair Back brush স্টাইল করেছেন এবং শেষের দিকে Semi-long, Shoulder Length, Ponytail স্টাইল করেছেন। এক সিনেমায় Long Hair এর সাথে French Cut দাড়ি রাখতেও দেখা গেছে সালমানকে।

ক্যাজুয়াল পোশাকের সাথে সালমান বিভিন্ন ধরনের Headband, Headscarf,Towel, Wrap পরেছেন ফ্যাশন অনুষঙ্গ হিসেবে। এগুলা মাথায় বাধার পাশাপাশি গলায় এমনকি জিন্সেও বাধতে দেখা গেছে সালমানকে। Arabian Shemagh Scarfs যেটা মধ্যপ্রাচ্যর লোকেদের বেশি পরতে দেখা যায় এই Scarf গুলাও সালমান অ্যারাবিয়ানদের মত মাথায় বেধেছেন এবং শীতের দিনে গলাতেও পরেছেন।

মরক্কোর লোকেদের মত Head Wrap পরেছেন। শীতের সময়ে স্কার্ফের পাশাপাশি বড় চাদরের মত এক ধরনের পোশাক ঘাড়ে বেধে শরীরের অর্ধেক অংশ পর্যন্ত নামিয়ে পরতেন যা কিনা আজকাল আমরা ফ্যাশন হিসাবে ব্যবহার করি।সালমান New Era কোম্পানি সহ বিভিন্ন কোম্পানির Adjustable Backstrap Cap পরতেন।

স্টাইলে ভ্যারিয়েশন আনতে এসব ক্যাপের Back Opening এ Ponytail বের করে রাখতেন। “স্বপ্নের পৃথিবী” ছবিতে সালমানকে Army Coat এর সাথে এই ধরনের Peaked Cap ব্যবহার করতে দেখা গেছে। ডিফেন্সের লোকেরা এই ধরনের ইউনিফর্ম পরলেও ফ্যাশন অনুষঙ্গ হিসেবে সালমান এটি ব্যবহার করেছিলেন। সালমান পরিবর্তী সময়ে একধরনের স্থবিরতা ভর করে বাংলা চলচ্চিত্রে।

অনেকটাই এক ঘেয়েমি পোশাক আর বিরক্তিকর অভিনয়ে সালমানের কাছ ঘেষতে পারেনি কোনো অভিনেতা এখনও। প্রচলিত ধারার বিপরীতে পোশাকআশাকে নিয়ে এসেছিলেন আধুনিকতার ছোঁয়া। কখনও হ্যাট ও লং কোটে ডিটেকটিভ লুকে, কাউবয় বা কবি-সাহিত্যিকদের মত পোশাকে, পাঞ্জাবি, টি-শার্ট বা লং শার্টের সাথে নানা রকমের ওয়েস্টকোট পরে,

শাহী পোশাকে বা যোদ্ধার বেশে, স্যুট-টাই পরে জেন্টল লুকে, মাঝি, রাখাল বা ঢাকাই রংবাজের গেটআপে, শার্টের কলার খাড়া করে কিংবা হাফহাতা গেঞ্জি,জিন্স উপরের দিকে ভাজ করে, হুডি-শার্ট কখনো ইন করে করে আবার ওপেনে রেখে বিভিন্ন লুকে পর্দায় হাজির হতেন সালমান। একমাত্র সালমান শাহ পেরেছিলেন ফ্যাশন আর স্টাইলে সব মহলের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে।

বেঁচে থাকলে ৪৯ বছরে আজ পা রাখতেন আমাদের সালমান। আজও বাংলাদেশে সালমান শাহ তার স্টাইলের জন্য বিখ্যাত। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো বাংলা সিনেমা অন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে যেত। বিশ্ব দরবারে বাংলা সিনেমা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারতো। সালমানের অনুপুস্থিতি আজও আমাদের ব্যথিত করে। আকাশের ঠিকানার খোলা চিঠিতে আমাদের হারিয়ে যাওয়া স্টাইল আইকনকে জানাই “শুভ জন্মদিন”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *