স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি: ধরাছোঁয়ার বাইরে সরকারি কর্মকর্তারা?

বাংলাদেশে করোনা সঙ্কটের সময় স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি ছিল অত্যন্ত আলোচনার বিষয়। জেকেজি কেলেঙ্কারি, মাস্ক কেলেঙ্কারি, ভুয়া রিপোর্ট প্রদানের ঘটনা-এমনকি লাইসেন্স ছাড়া হাসপাতাল পরিচালনা করার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছিল এই সময়ে।

আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এই সমস্ত ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে গ্রেপ্তার করেছে, তাদের বিচার প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে এই যে, স্বাস্থ্যখাতের এই দুর্নীতির সঙ্গে যে সমস্ত সরকারি কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা ছিলেন, তাঁরা এখন পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের বিরুদ্ধে কোনরকম আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার দৃশ্যমান খবর পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্যখাতে প্রথম দুর্নীতির বিষয়টি আলোচনায় আসে এন-৯৫ মাস্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে এবং সেই মাস্ক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছিল জেএমআই নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই জেএমআই প্রতিষ্ঠানের মালিক আব্দুর রাজ্জাককে দুর্নীতি দমন ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল, কিন্তু আব্দুর রাজ্জাক এখন পর্যন্ত বহাল তবিয়তে আছেন।

মাস্ক আমদানির কথা থাকলেও গাজীপুরে মাস্ক তৈরি করে সেটাকে এন-৯৫ মাস্ক বলে সরবরাহ করা হয়েছিল এবং সেগুলো যখন বিভিন্ন হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছিল তখন চিকিৎসকরা অভিযোগ করেছিলেন যে, এই মাস্কগুলো এন-৯৫ মাস্ক নয়। তারপর এই নিয়ে হৈচৈ শুরু হয়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত যে সমস্ত জিনিসগুলো দেওয়া হয়েছে তা আসলে সঠিক জিনিস কিনা তা তদন্তের জন্যে নির্দেশনা দেন।

অথচ এই এন-৯৫ মাস্ক কিভাবে হাসপাতালে এসেছে, সেখানে সরকারি কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিবের দায় কতটুকু তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এরা কেউ-ই আইনের আওতায় আসেননি।

এরপর বাংলাদেশে করোনা মোকাবেলার জন্য দুটি প্রকল্প চালু করা হয়। একটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এবং অন্যটি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে। দুটি প্রকল্পেরই প্রধান করা হয়েছিল ডা. ইকবাল কবিরকে। তিনি আবার একাধারে ডিরেক্টর (পরিকল্পনা) এবং লাইন ডিরেক্টর (পরিকল্পনা) পদের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

এই নিয়ে লেখালেখির পর তাকে ঐ দায়িত্বগুলো থেকে ওএসডি করা হয় বটে, তবে তাকে আইনের আওতার আনার এখন পর্যন্ত কোন উদ্যোগ দেখা যায়নি। বিশেষ করে এই প্রকল্পের আওতা থেকে যে সমস্ত টেন্ডার করা হয়েছে, যে সমস্ত কেনাকাটা করা হয়েছে তা নিয়ে ভয়াবহ জালিয়াতির খবর প্রতিদিনই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে।

এমনকি যাদের কোনদিন মাস্ক সরবরাহের অভিজ্ঞতা নেই। কোথাও কোথাও ভূয়া কোম্পানি ভূয়া ঠিকানা ব্যবহার করে এই ধরণের পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে যা এক ধরণের ভয়ঙ্কর জালিয়াতি। ঐ সমস্ত কার্যাদেশগুলোর সবই দেওয়া হয়েছিল ডা. ইকবাল কবিরের নামে। অথচ এখন পর্যন্ত ডা. ইকবাল কবির ধরাছোঁয়ার বাইরে। করোনার সময়ে আরেকটি আলোচিত ঘটনা ছিল জেকেজির ভুয়া রিপোর্ট কেলেঙ্কারি।

ডা. সাবরিনা এবং তার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরী মানুষের করোনা পরীক্ষা না করেই ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছেন এবং কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। র‍্যাব যখন তাদেরকে গ্রেপ্তার করে তখন দেখা যায় যে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জেকেজি’তে নিজে গিয়েছিলেন এবং এই করোনা পরীক্ষা কার্যক্রমের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণও করেছিলেন এবং জেকেজি’কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরই করোনা পরীক্ষার অনুমোদন দিয়েছিল।

তাহলে এই ধরণের একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে করোনা পরীক্ষার অনুমতি দেওয়ার অপরাধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের কি কোন অপরাধ হবেনা? এই প্রশ্ন জনমনে উঠেছে। এখন পর্যন্ত ডা. আবুল কালাম আজাদকে দুর্নীতি দমন কমিশনে দুদিন জিজ্ঞাসাবাদ করা ছাড়া কিছুই করা যায়নি।

তবে করোনা সঙ্কটের সময় সবচেয়ে ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনা ঘটিয়েছে প্রতারক সাহেদ। রিজেন্ট হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার জন্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে চুক্তিস্বাক্ষর অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য মন্ত্রী, স্বাস্থ্য সচিব ছাড়াও আরও তিনজন সরকারি উর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে যখন র‍্যাব অনুসন্ধান করে জানতে পারে যে, করোনা পরীক্ষা না করেই তাঁরা রিপোর্ট দিয়েছে, তখন কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে।

দেখা যায় যে, রিজেন্ট হাসপাতালের আসলে লাইসেন্সই নেই। তাহলে লাইসেন্স ছাড়া রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করার অপরাধে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কোন শাস্তি হবেনা? এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠতে পারে। অথচ এই নিয়ে সরকারি কর্মকর্তারা ব্লেমগেম খেলছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেছেন যে, সাবেক সচিব আসাদুল ইসলামের মৌখিক নির্দেশে তিনি এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন।

আসাদুল ইসলামের সঙ্গে দুদকের কর্মকর্তারা যোগাযোগ করছিলেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন তাঁর অফিসে গিয়ে। কিন্তু তারপর কার নির্দেশনায় রিজেন্ট হাসপাতালকে অনুমোদন দেওয়া হলো সে সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। অথচ রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে সেই মামলায় কোন সরকারি কর্মকর্তাদের নাম পর্যন্ত নেই।

আইনজ্ঞরা বলছেন যে, রিজেন্ট হাসপাতাল মামলা, জেকেজি মামলা বা মাস্ক কেলেঙ্কারির মামলাগুলোতে যারা তাদেরকে অনুমোদন দিয়েছে তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত না করার ফলে মামলাগুলো এমনিতেই দূর্বল হয়ে যাচ্ছে। জেকেজি যদি কোনভাবেই অনুমতি না পেত তাহলে পরীক্ষা করতে পারতো না,

রিজেন্ট হাসপাতাল কিভাবে লাইসেন্স ছাড়াই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তি করলো সেই সমস্ত প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত রেখেই এই সাহেদ, আরিফ বা সাবরিনার বিচার করা সম্ভব নয়। যারা এই রকম দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তাদেরকে আইনের আওতায় না আনার ফলে এই ধরণের দুর্নীতিগুলোর সমূলে উৎপাটন আদৌ সম্ভব কিনা সে প্রশ্নও জনমনে উঠেছে। সূত্র: বাংলা ইনসাইডার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *