২ বেলা খেতে নাপারা এই ক্রিকেটার আজ কলকাতায়নিয়মিত বল করেন

ঘড়িতে তখন কাঁটায় কাঁটায় রাত তিনটে। গোটা গ্রাম তখন শুনশান। সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বছর আঠারোর ছেলেটা। দেড়ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে স্টেশন, অতঃপর সেখান থেকে কলকাতা। সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্রিকেট ক্যাম্পে তিলে তিলে নিজেকে গড়ে তুলেছিল ছেলেটা।

দিনের পর দিন দারিদ্রতা ক্রমশ গোটা সংসার গ্রাস করতে শুরু করেছে, জানলার ছেঁড়া পর্দার ফাঁক দিয়ে ওইটুকুই আশার আলো ঘরের মেঝেয় এসে পড়েন।শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা এটাই ছিল ছেলেটার রোজনামচা। আজ সে কলকাতা নাইট রাইডার্স দলের নিয়মিত নেট বোলার। নাম জিন্না মণ্ডল।

ছোটোবেলা থেকেই জিন্না কখনও স্বচ্ছ্বল সংসার দেখেনি। বাবা-মা, দুই ভাই এবং এক বোনকে নিয়েই তাঁর গোটা পৃথিবী। সংসারে যে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, সেকথা বলাই বাহুল্য।শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া একটা ছোট্ট বাড়িই জিন্নার বাবা রবিউল ইসলামের মাথা গোঁজার ঠাই। পেশায় তিনি জেলে।

তবে বাড়িতে থাকলে বাবার সঙ্গে মাঝেমধ্যেই মাছ ধরতে যায় জিন্নাও।ছেলের কথা বলতে গিয়ে সহজেই তাঁর চোখে জল চলে এল। বললেন, ‘অত্যন্ত দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করেই আমার ছেলে বেড়ে উঠেছে। ওর স্বপ্নপূরণ করার জন্য গ্রামের প্রত্যেকেই বিভিন্নভাবে সাহায্য় করেছে। আমরা গরীব মানুষ।

আমার কখনই ওই জায়গায় যাওয়ার ক্ষমতা ছিল না। ছোটোবেলা থেকেই নারকেলের মুচি নিয়ে হাত ঘোরাত, আর বলত আমি ক্রিকেটার হব।অবশেষে পার্শ্ববর্তী গ্রামের এক ভদ্রলোক ওকে সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে নিয়ে যায়। ওর খেলা স্যারের খুব ভালো লাগে। অবশেষে দমদমের রঞ্জিত স্যার কলকাতা নাইট রাইডার্স দলে সুযোগ করিয়ে দেয়।’

উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার বিবিপুরের বাসিন্দা জিন্না। প্রথম সাক্ষাতেই ১৮ বছরের এই জোরে বোলারের পারফরম্যান্স এতটাই ভালো লেগে যায়, তাকে ‘বসিরহাটের জোরে বোলার’ নাম দিয়ে দেন সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

জিন্নার ২২ গজের লড়াই হয়ত এখনও সেভাবে প্রচারের আলো পায়নি, কিন্তু তাঁর অদম্য জেদ প্রতিদিন তাঁর পারফরম্যান্স শানিত করে তুলছে।এইসময় ডিজিটালকে ফোনে জিন্না জানালেন, আজ সাফল্যের পথে হাঁটা শুরু করলেও, এতদিন ধরে তাঁকে অনেক প্রতিবন্ধকতার সাক্ষী থাকতে হয়েছে।

তবে ‘গরীবীর’ কাছে হার মেনে কখনই তিনি থেমে যাননি। চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন। আর সেই স্বপ্নে ভর করেই আজ নাইট ব্রিগেডের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।বললেন, ‘তবে আমার এই চলার পথে অনেককে যেমন পাশে পেয়েছি, তেমন অনেকেই আবার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু, তাতে আমার অবশ্য খুব একটা বেশি অসুবিধে হয়নি।আজ আমি সেন্ট্রাল ক্যালকাটা স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলছি। রঞ্জিৎ স্যার না থাকলে, আজ হয়ত আমি এতদুর আসতে পারতাম না। আশা করছি, আগামীদিনে আমি বাংলার দলের হয়ে খেলতে পারব।’

তবে জিন্নার মা কোহিনুর বিবি অবশ্য চান তাঁর ছেলে যেন বাংলা ক্রিকেট দলে সুযোগ পায়। তিনি বললেন, ‘আমি আশা করছি, ছেলেটা যেন ভালো করে খেলতে পারে।যেন ভালো জায়গায় যায়, বাংলা দলে যেন সুযোগ পায়। আমাদের সংসারে প্রচুর অর্থাভাব রয়েছে। ছাগল-মুরগি পুষে আমরা খাই। আমাদের সংসার এভাবেই চলে। আমি চাই ও অনেক বড় হোক।’

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.